প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত মালয়েশিয়া সফরে উভয় দেশ জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ ও পারস্পরিক লাভজনক অভিবাসন অব্যাহত থাকে। দুই দেশের দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকে বিদ্যমান এমওইউ মূল্যায়ন এবং বর্তমান প্রয়োজন অনুসারে নতুন আপডেটেড এমওইউ প্রণয়নের কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কিন্তু জনশক্তি খাতের এই বাজারের সিন্ডিকেট নির্মূলের স্পষ্ট কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এই বাজার নতুন করে চালু হলেও যেকোনো সময় আবারও বন্ধ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বেস্টিনেটের (মালয়েশিয়াভিত্তিক একটি বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান) প্রতিষ্ঠাতা আমিনুল ইসলাম আবদুল নূর জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও বর্তমানে মালয়েশিয়ার নাগরিক। এই আমিনুলের সহযোগী হলেন রুহুল আমিন। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানিতে সিন্ডিকেটের মূল কারিগর এই দুই ব্যক্তি। এ দুজন বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বসবাস করছেন। এ দুজনকে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দিতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার মালয়েশিয়া সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছিল।
গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন যে ওই দুজনকে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বাংলাদেশ আলোচনার টেবিলে উত্থাপন করবেন। কিন্তু সফর শেষে এই বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। আবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের কয়েক সপ্তাহ আগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ও মানব পাচার সংক্রান্ত দীর্ঘ তদন্তের পর ১০৩ জন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক বা ব্যবসায়ীকে এই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি (অব্যাহতি বা ছাড়) দেওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের অভিবাসন খাতে একটি বড় আলোচিত খবর। তাদের বিরুদ্ধে অভিবাসন খাতের নির্দিষ্ট আইন অনুযায়ী মামলা না করায় ১০৩ জন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক বা ব্যবসায়ী এই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়ে যান।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম গত ২০ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফ করেন। ওই ব্রিফে দৈনিক সময়ের আলোর এই প্রতিবেদক জানতে চান যে, গত অন্তর্বর্তী সরকার এই বাজারের সিন্ডিকেট নির্মূলে বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা আমিনুল ইসলাম আবদুল নূর যিনি জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও বর্তমানে মালয়েশিয়ার নাগরিক এবং তার সহযোগী রুহুল আমিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে মালয়েশিয়ার কাছে ফেরত চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে এই বিষয়টি কি আলোচনায় আসবে কি না?
জবাবে সরাসরি কিছু না বলে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, আমরা নিশ্চয়ই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের আরও কর্মী নেওয়ার জন্য অনুরোধ করব। যে প্রক্রিয়াটা বর্তমানে বিদ্যমান তারা সেই পুরো প্রক্রিয়াটাকে একটা রিভিউ প্রসেসের মধ্যে নিচ্ছে। সুতরাং আমরা মনে করি যখন রিভিউ প্রসেসটা শেষ হবে তখন বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে। আমাদের তরফ থেকে তো অবশ্যই তাদের অনুরোধ করা হবে। আমার বক্তব্যের মূল সুরটা হলো অবশ্যই আমরা কর্মী নেওয়ার জন্য মালয়েশিয়াকে অনুরোধ করব। কিন্তু এই সফরে আরও যে ডাইভার্স জরুরি কম্পোনেন্টগুলো আছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের, সেগুলো আলোচনা হবে।
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবরণীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বলা হয়েছে, নেতৃবৃন্দ জনগণের মধ্যে সংযোগের গুরুত্ব স্বীকার করেন এবং মালয়েশিয়ার উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানকে স্বাগত জানান।
তারা উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশি প্রবাসী সম্প্রদায় দুই দেশের মধ্যে বিনিময় ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত প্রস্তাবকে স্বীকৃতি দেয়। মালয়েশিয়ার বর্তমান বিদেশি শ্রম নীতি অনুসারে, নতুন বিদেশি কর্মী কোটা অনুমোদন কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে যাচাইকৃত নিয়োগকর্তার চাহিদা ও সেক্টরাল সিলিংয়ের ওপর নির্ভর করে।
অনুমোদিত কোটার ক্ষেত্রে উভয় দেশ স্বচ্ছ, ন্যায্য, বৈষম্যহীন ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে, যেখানে শুধু বিশ্বস্ত ও যোগ্য নিয়োগ সংস্থা ব্যবহার করা হবে। উভয় দেশ জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ ও পারস্পরিক লাভজনক অভিবাসন অব্যাহত থাকে। এই বৈঠকে বিদ্যমান এমওইউ মূল্যায়ন এবং বর্তমান প্রয়োজন অনুসারে নতুন আপডেটেড এমওইউ প্রণয়নের কাজ শুরু হবে।
রিক্রুটিং এজেন্সি ঐক্য পরিষদের প্রেসিডেন্ট ও বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব এম টিপু সুলতান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, প্রতীক্ষায় ছিলাম যে প্রধানমন্ত্রীর সফরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর নির্দিষ্ট ঘোষণা পাওয়া যাবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট তারিখ পাওয়া যায়নি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালু হবে বলা হলেও দ্রুততম সময় কত দিনে শেষ হবে তা পরিষ্কার না।
দৃশ্যমান কিছু দেখা না গেলেও আমরা ব্যবসায়ীরা এখনও আশাবাদী। এ সফরে এই শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট নির্মূল সংক্রান্ত কোনো বার্তা পাইনি। উল্টো প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে মানব পাচারের মামলা থেকে ১০৩ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই খাতের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটকে যদি আইনের আওতায় আনা না যায় তবে এই বাজার নিয়ে ভবিষ্যতে ভালো কিছু হবে না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সিন্ডিকেটের সঙ্গে দুই দেশই জড়িত, দুই দেশের সরকার যৌথভাবে না চাইলে এই ইস্যুতে সমাধান মিলবে না। যার মূলে রয়েছে টাকার খেলা। কেননা এই টাকার সঙ্গে সব পর্যায়ের ব্যক্তিরা জড়িত। আগের সরকারের সঙ্গে সিন্ডিকেটের যারা ছিল, তারা এখন বর্তমান সরকারের সঙ্গে মিশছে। এই একই ব্যক্তিদের সঙ্গে মালয়েশিয়া সরকারের উচ্চ পর্যায়েও যোগাযোগ রয়েছে।
এ জন্যই সিন্ডিকেট নির্মূলের কোনো বার্তা নেই। এই বিষয়ে বাংলাদেশ যদি খোলামেলাভাবে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলাপ না করে তবে সমাধান আসবে না। ফলে পুরোনো সিন্ডিকেট আবার নতুন চেহারা নিয়ে হাজির হবে এবং এই বাজার চালু হলেও আবার বন্ধ হয়ে যাবে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়া মূলত বিদেশ থেকে দুই ধরনের কর্মী সংগ্রহ করে। যাদের মধ্যে একটি হচ্ছে কম দক্ষতাপূর্ণ কর্মী, যা কলিং ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট বলা হয়। আরেকটি হচ্ছে দক্ষ কর্মী, যা এমপ্লয়মেন্ট পাস বা ইপি ভিসা বলা হয়। মালয়েশিয়া সরকার তাদের দেশে প্রবাসী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে, যা গত ১ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। মালয়েশিয়া মূলত তাদের দেশে অতীতের মতো বিশাল আকারের কর্মী নিয়োগ দিতে চায় না।
মালয়েশিয়া সরকার নিজেদের স্থানীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে চায় এবং বিদেশি কর্মীর অনুপাত কমাতে চায়। এ জন্য আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি বিদেশি কর্মী নিয়োগ ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য স্থির করেছে এবং সেই মোতাবেক কাজ করছে। বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়ে মালয়েশিয়া নতুন করে এআইভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে।
বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়ে মালয়েশিয়া নতুন করে এআইভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের মধ্যে প্রস্তুতি হিসেবে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে। যেখানে ডিজিটাল বা এআইভিত্তিক নিয়োগ সিস্টেম নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও স্টেকহোল্ডার বৈঠক করেছে। তাদের প্রস্তাবিত নতুন এই সিস্টেমের নাম বেস্টিনেট (এই প্রক্রিয়া নিয়ে এরই মধ্যে বিতর্ক উঠেছে)।
গত ২১ এপ্রিল মালয়েশিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিদেশি কর্মী নিয়োগের নতুন কর্মপন্থার প্রস্তাব এখনও পর্যালোচনাধীন, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নতুন এই প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে প্রথমে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমোদন করবে। তারপর সেটি তাদের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে উঠবে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অনুমোদন করার পর তা কার্যকর হবে।
সময়ের আলো/এসএকে