দিন দিন বেড়েই চলছে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান হিসেবে বাংলাদেশ ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার পেলেও তার বিপরীতে আগের নেওয়া ঋণের সুদ ও আসলের টাকা পরিশোধে দিতে হয়েছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার।
ফলে প্রাপ্ত অর্থের প্রায় ৮৯ দশমিক ২৮ শতাংশই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়ে গেছে। আর এর বড় অংশই গেছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানের কাছে। সবমিলিয়ে যেন ঋণের টাকা খোদ ঋণই খেয়ে নিচ্ছে।
মঙ্গলবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রকাশিত জুলাই-মে মাসের বিদেশি ঋণ পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই বিদেশি ঋণদাতা সংস্থা ও দেশগুলোর কাছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এটি দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ঋণের সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পরিশোধ বেড়েছে ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা প্রায় ৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।
ঋণ পরিশোধের এই চাপ বৃদ্ধির পেছনে গত এক দশকে নেওয়া বড় বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের ঋণ প্রধান কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ঋণের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ঋণের আসল পরিশোধ করা হয়েছে ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৩৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অন্যদিকে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের ১৪০ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের তুলনায় বেশি।
একদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে কমেছে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ৪২২ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ঋণ ও অনুদান প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
ফলে প্রতিশ্রুতি কমেছে ১২৬ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। সবচেয়ে বেশি কমেছে অনুদান। চলতি অর্থবছরে অনুদান প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৮ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার। ঋণের অর্থছাড়েও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে অর্থছাড় হয়েছে ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০৩ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ডলার কম। গত অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড়ের পরিমাণ ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক- প্রায় ৯৬ কোটি ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া, যারা দিয়েছে প্রায় ৯৩ কোটি ডলার। এরপর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৭৮ কোটি ডলার, চীন ৫৩ কোটি ডলার, ভারত ২৫ কোটি ডলার এবং জাপান ৪৩ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে নতুন ঋণের অর্থ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের পরিবর্তে ক্রমশ পুরোনো ঋণ পরিশোধেই বেশি ব্যয় হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক অর্থায়নব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে দেশের প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে