‘ভোক্তা অধিকারে’ই ভোক্তা হয়রান

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

হয়রানির প্রতিকার চেয়ে ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে’ অভিযোগ করে এবার নিজেই হয়রানির শিকার হলেন এক অভিযোগকারী ভোক্তা। শুনতে অবাক

2026-06-24T05:39:32+00:00
2026-06-24T05:39:32+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
‘ভোক্তা অধিকারে’ই ভোক্তা হয়রান
শাকিল আহমেদ
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ৫:৩৯ এএম 
প্রতীকী ছবি
হয়রানির প্রতিকার চেয়ে ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে’ অভিযোগ করে এবার নিজেই হয়রানির শিকার হলেন এক অভিযোগকারী ভোক্তা। শুনতে অবাক লাগলেও এমনই ঘটনা ঘটিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিযোগ দায়েরকারী। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি এই প্রতিষ্ঠান কি ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ করছে নাকি নিজের দায় এড়াতেই বেশি ব্যস্ত?

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০০৯ সালে আধা-বিচারিক সংস্থা হিসেবে গঠিত হয় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। এটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পণ্য ও সেবায় প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জরিমানা আদায় এবং ভেজাল প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করা। অধিদফতরটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রতারিত ভোক্তাদের কাছ থেকে অনলাইন ও সশরীরে অভিযোগ নেয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদায় করা জরিমানার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, কার্যাবলিতে বলা হয়েছে- বাজার তদারকির মাধ্যমে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ, ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি, জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার ও ওয়ার্কশপ আয়োজনসহ অন্যান্য কার্যক্রম চালাবে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া এর ভিশন ও মিশন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর কার্যকর বাস্তবায়ন করবে এই অধিদফতর।

কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারের এসব ভিশন ও মিশন প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন এর কিছু কর্মকর্তা। প্রতিনিয়ত পণ্য ক্রয় ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভোক্তারা হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে কোথাও প্রতিষ্ঠানটির দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায় না বরং নিজ উদ্যোগে কোনো ব্যক্তি অভিযোগ জানালে সেটিও আমলে নেন না কর্মকর্তারা।

ভোক্তা অধিকার অধিদফতরে করা একটি হয়রানির অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত ১৪ জুন হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হয়ে বরিশালগামী শ্যামলী পরিবহনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ করেন মো. শফিকুর নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগ নম্বর- (২০২৬-১০১৪৫১৭৩৫৯২৮৭৯)।

সময়ের আলোকে ভুক্তভোগী বলেন, আমি ও আমার পরিবার শ্যামলী পরিবহনের নিয়মিত যাত্রী। কিন্তু প্রায়ই এই পরিবহনে যাত্রাকালে আমি বা আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। সবশেষ গত ১৪ জুন  আমি  প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কারওয়ান বাজারস্থ প্রধান কার্যালয়ে যাই। অভিযোগ শাখার সহকারী পরিচালক মো. শাহ আলমকে মৌখিকভাবে সবকিছু জানাই। পুরো ঘটনা শুনে তিনি আমাকে তাদের অনলাইনে একটি অভিযোগ দিতে বলেন এবং ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

তার কথা অনুযায়ী আমি ঘটনার সব বর্ণনা দিয়ে ওইদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে তথ্য-প্রমাণসহ একটি লিখিত অভিযোগ দিই এবং অভিযোগের বিষয়টি তাকে আবার নিশ্চিত করি। তখন তিনি আমার কাছে অভিযোগ নম্বর জানতে চান। আমি অভিযোগ নম্বরটি তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠাই। ভেবেছিলাম পরদিনই হয়তো আমাকে শুনানির জন্য ডাকা হবে। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম, এটা বাংলাদেশ আর তারা সরকারি কর্মকর্তা; তাই এত বেশি প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। তারপরও ভেবেছিলাম, যেহেতু সবকিছু শুনে অভিযোগ করতে বলেছেন, হয়তো কোনো ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু না, দুদিন পার হয়ে গেল, কোনো খবর নেই।

এরপর ১৭ জুন সকাল ১০টায় আমি ওই কর্মকর্তাকে (শাহ আলম) আবার ফোন করি কিন্তু এবার তিনি আমার ফোন কেটে দেন। এরপর তাকে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের আপডেট জানতে চেয়ে একটি বার্তা দিই। তখন তিনি শুধু লিখেন- রোজিনা সুলতানা, সহকারী পরিচালক, ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়। জাস্ট এতটুকুই।

এরপর আমি পরের বার্তায় আবার জানতে চাই, ডাকবে কবে? প্রায় দুই ঘণ্টা পর, ১১টা ৫৭ মিনিটে, প্রতিউত্তরে তিনি লিখেন, কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন প্লিজ। 

এরপর তার কাছে আমি প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকের (ডিজি) নম্বর চাই। এর আধা ঘণ্টা পরে (১২টা ৩৩ মিনিটে) তিনি আমাকে সহকারী পরিচালক রোজিনা সুলতানা ও ডিজির নম্বর ফরোয়ার্ড করেন। ভেবেছিলাম এবার হয়তো কোনো প্রতিকার পাব। কিন্তু সেখানে আরও খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম।

১৮ জুন বিকাল ৪টা ৪৯ মিনিটে শাহ আলমের দেওয়া সহকারী পরিচালক রোজিনা সুলতানার নম্বরে দুবার ফোন করি কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি এবং পরবর্তী সময়ে ব্যাকও করেননি। এরপর সহকারী পরিচালক মো. শাহ আলমের দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদের নম্বরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তিনবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বারবারই ‘রং নম্বর’ বলে ফোন কেটে দেন। অর্থাৎ সহকারী পরিচালক শাহ আলম আমাকে একটি ভুল নম্বর দিয়েছেন।

এরপর প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া মহাপরিচালকের নম্বরে ফোন দিলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। আর এখানেই থেমে যায় আমার সব চেষ্টা। অর্থাৎ একটি হয়রানির অভিযোগ করতে গিয়ে আরও একটি হয়রানির শিকার হলাম।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- আমার অভিযোগ যদি আমলে নেওয়ার মতো না-ই হয়, তা হলে সবকিছু শুনে শাহ আলম কেন আমাকে অভিযোগ দিতে বললেন? এত বাজে অভিজ্ঞতার পর যত হয়রানিরই শিকার হই না কেন, আমি আর কোনো দিন অভিযোগ করতে যাব না। 

অভিযোগকারীর সঙ্গে কথা বলার পর গতকাল রাত ৯টা (এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত) ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ওয়েবসাইটে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ১৪ জুন আবেদন করা হয়, প্রাপ্তির তারিখ ১৫ জুন, শুনানির জায়গা ফাঁকা এবং আবেদনটি নথিভুক্তের তারিখ ১৭ জুন উল্লেখ করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী পরিচালক রোজিনা সুলতানার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের বর্তমান অবস্থায় বলা হয়েছে- অভিযোগটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। আর নথিভুক্তির কারণ হিসেবে খুবই হাস্যকর একটি মন্তব্য করা হয়েছে যে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা প্রদান করেনি। ব্যাস, এতটুকু লিখেই দায়িত্ব থেকে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক রোজিনা সুলতানা।


এ বিষয়ে ভুক্তভোগী বলেন, এটি খুবই নিম্নমানের মন্তব্য। কারণ আবেদন করা হয়েছে অনলাইনে। সেখানে যদি কোনো তথ্যের ঘাটতি থাকে, তা হলে সেটি অনুমোদিত হয় কীভাবে? আমি তো সব তথ্যই দিয়েছি। 

অভিযোগকারীর এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালককে ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেননি বরং প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে গিয়ে আরও বড় একটি অসংগতি চোখে পড়ে এ প্রতিবেদকের। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে কর্মকর্তাদের নামের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে মহাপরিচালকের পদ। তবে অবাক করা বিষয় হলো, নামের জায়গায় শুধু ‘জনাব’ লেখা রয়েছে কিন্তু মহাপরিচালকের নাম নেই। 

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   ভোক্তা  অধিকার  হয়রান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: