বুধবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে যেন ভিন্ন এক গল্প লেখা হলো। পাকিস্তান যখন নতুনদের নিয়ে ভবিষ্যতের দল গড়ার স্বপ্নে সিরিজ শুরু করেছিল, তখন বাংলাদেশ মাঠে নামল আত্মবিশ্বাস আর গতি নিয়ে। শেষ পর্যন্ত সেই লড়াইয়ে জয়ী হলো স্বাগতিকরাই। তরুণ পেসার নাহিদ রানার বিধ্বংসী বোলিং আর তানজিদ হাসানের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে পাকিস্তানকে সহজেই হারিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।
সিরিজ শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পাকিস্তানের নতুন মুখগুলো। ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপকে লক্ষ্য করে দল সাজানোর পরিকল্পনায় বেশ কয়েকজন তরুণ ক্রিকেটারকে সুযোগ দেয় পাকিস্তান। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বুধবারের প্রথম ওয়ানডেতেই একসঙ্গে অভিষেক করানো হয় চার ব্যাটার সাহিবজাদা ফারহান, মাআজ সাদাকাত, শামিল হুসাইন ও আবদুল সামাদকে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের প্রথম দিনটি হয়ে উঠল কঠিন এক অভিজ্ঞতা। শুরু থেকেই বাংলাদেশের তরুণ পেসার নাহিদ রানা যেন ঝড় তুললেন পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনে। তার দ্রুতগতির বোলিং আর বাউন্স পাকিস্তানের ব্যাটারদের বারবার অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। কখনো শর্ট লেন্থ, কখনো ফুল লেন্থ— দারুণ বৈচিত্র্যে বল করে তিনি ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করেন।
এমনকি পাকিস্তানের অভিজ্ঞ ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান এবং সালমান আগাও তার নিখুঁত বোলিংয়ের সামনে টিকতে পারেননি। একে একে ভেঙে পড়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৪ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট তুলে নিয়ে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেন নাহিদ রানা। তার এই আগুনঝরা স্পেলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি পাকিস্তান। মাত্র ১১৪ রানে গুটিয়ে যায় তাদের ইনিংস, যা বাংলাদেশের বিপক্ষে আগে ব্যাট করে পাকিস্তানের সর্বনিম্ন স্কোর।
এত ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ খুব বেশি সময়ও নেয়নি। পাকিস্তানের বোলাররা শুরু থেকেই ছন্দহীন ছিলেন। শৃঙ্খলার অভাবে তারা ১৪টি ওয়াইড বল করে বসেন, যা বাংলাদেশের কাজ আরও সহজ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ৮ উইকেট হাতে রেখেই এবং ২০৯ বল বাকি থাকতে জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
একই সঙ্গে আবারও পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা ওয়ানডে সিরিজ জয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হলো। এর আগে ২০১৫ সালে পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ।
ম্যাচের সবচেয়ে চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স এসেছে তানজিদ হাসানের ব্যাট থেকে। রান তাড়ায় নেমে শুরু থেকেই পাকিস্তানের বোলারদের ওপর চড়াও হন তিনি। মাত্র ৪২ বলে অপরাজিত ৬৭ রান করেন তানজিদ। তার ইনিংসে ছিল সাতটি চার ও পাঁচটি ছক্কা। পেসারদের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী শট আর স্পিনারদের ওপর দাপুটে আক্রমণে দ্রুত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়েও তানজিদের ব্যাট দারুণ ছন্দে রয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে তিনি ভালো ফর্মে ছিলেন, যদিও বড় মঞ্চে সেই সুযোগটা পাননি। তবে গত মাসে দুটি ঘরোয়া টুর্নামেন্টে প্রচুর রান করেছেন তিনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ইনিংস তার সেই ধারাবাহিকতারই প্রমাণ।
অন্যদিকে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ে একমাত্র লড়াইটা দেখা গেছে ফাহিম আশরাফের কাছ থেকে। আট নম্বরে নেমে তিনি ৩৭ রান করেন, যা ছিল দলের সর্বোচ্চ। ঢাকার মাঠে তার আগেও একটি স্মরণীয় ইনিংস রয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে এই একই ভেন্যুতে টি- টোয়েন্টি ম্যাচে ৩২ বলে ৫১ রান করে প্রায় একাই পাকিস্তানকে জয়ের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলেন। তাই দ্বিতীয় ম্যাচে তাকে ব্যাটিং অর্ডারে আরও ওপরে তুলে আনার কথাও ভাবতে পারে পাকিস্তান।
প্রথম ম্যাচের এমন পরাজয়ের পর এখন ঘুরে দাঁড়ানোই পাকিস্তানের বড় চ্যালেঞ্জ। নতুনদের নিয়ে শুরু করা তাদের যাত্রাটা শুরু হয়েছে হতাশা দিয়ে। তবে রিজওয়ান, সালমান আগা ও অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদির মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের নিয়ে তারা দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছে।
দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ সম্ভবত একই একাদশ ধরে রাখবে। কারণ প্রথম ম্যাচে মিরপুরের পিচ পেসারদের ভালো সহায়তা করেছে এবং সেই সুবিধা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন বাংলাদেশের বোলাররা। পাকিস্তান অবশ্য দলে পরিবর্তন আনতে পারে। প্রথম ম্যাচে ৩.১ ওভারে ২৪ রান দেওয়া মোহাম্মদ ওয়াসিমের বদলে একাদশে জায়গা পেতে পারেন হারিস রউফ। এতে তাদের পেস আক্রমণ আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মিরপুরের উইকেট প্রথম ম্যাচে বেশ বাউন্সি ছিল এবং পেসারদের জন্য সহায়ক প্রমাণ হয়েছে। যদি দ্বিতীয় ম্যাচেও একই ধরনের উইকেট থাকে, তা হলে পাকিস্তানের পেসাররাও সেটিকে কাজে লাগিয়ে সিরিজে সমতা ফেরানোর চেষ্টা করবে।
তবে ম্যাচের দিন আবহাওয়াও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। পূর্বাভাসে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও প্রথম ম্যাচের সময় সমস্যা হয়নি।
এখন দেখার বিষয়, দ্বিতীয় ম্যাচে আবহাওয়া ও মাঠের পরিস্থিতি কোন দলের পক্ষে যায়, আর সিরিজের লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়।
এফআর