এক বছর— সময়টা খুব বড় নয়, তবু রোকেয়ার কাছে এ যেন এক অনন্তকাল। বাপের বাড়ির ছোট ঘরটিতে দুটি শিশু নিয়ে সে থাকে। কাগজে-কলমে সে এখনও কারও স্ত্রী। তবে— না বিধবা, না ডিভোর্সি। অথচ বাস্তবে সে নিঃসঙ্গ, একেবারে একা।
বিকালে রোদের আলো যখন জানালার ফ্রেমে ফিকে হয়ে পড়ে, বড় ছেলে রাফি দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। ছোট মেয়ে রিমি মায়ের আঁচল ধরে প্রশ্ন করে, ‘মা-বাবা কই?’
রোকেয়া চুপ করে থাকে। তার ঠোঁট শুকিয়ে আসে। এই প্রশ্নের কোনো প্রস্তুত উত্তর নেই তার কাছে। একদিন সে বলেছিল, ‘দূরে গেছে।’
‘কবে আসবে?’
সেদিনও সে চুপ ছিল। স্বামী তাকে কিছু না জানিয়েই চলে গেছে। কেন, কোথায়, কেমন আছে— কোনো খবরও জানা নেই। শুধু হঠাৎ একদিন সংসারের শব্দ থেমে গেছে। আলমারির একপাশ খালি। বালিশে আর তার গায়ের কোনো গন্ধ নেই। রেখে গেছে দুটি শিশুর প্রতীক্ষা আর রোকেয়ার অগণিত অপ্রকাশিত প্রশ্ন।
রোকেয়ার বোন এই এক বছর ধরে পাশে আছে। বাজার করে, স্কুলের ফি দেয়, মাঝেমধ্যে রোকেয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘তুই কাজ শুরু কর।’
রোকেয়া কাজ করতে চায়। তার হাতের কাজ ভালো, পড়াশোনাও আছে। কিন্তু এই দুটি অবুঝ শিশুকে কার কাছে রেখে যাবে? ওরা তো এখনও রাতে ঘুম ভেঙে গেলে অবচেতনে বাবাকে ডাকে। সবচেয়ে বড় কষ্টটা অন্য জায়গায়। সন্তানদের কী পরিচয় দেবে?
মিথ্যে বলবে, ‘বাবা মারা গেছে? নাকি বলবে, ‘বাবা বেঁচে আছে?’ তা হলে ওরা জিগ্যেস করবে, ‘তিনি আসেন না কেন?’
এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে রোকেয়া নিজেকেই অপরাধী মনে করে। যেন তার কোনো ব্যর্থতার কারণেই এই শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।
কখনো কখনো সে ভাবে, সংসারে রাগ-অভিমান হয়, মনোমালিন্য হয়। কিন্তু সন্তানদের কথা না ভেবে কি মানুষটা সব ছেড়ে চলে যেতে পারে? রোকেয়া তো টাকা চায়নি, স্বামীর কাছে কোনো দাবি তোলেনি। শুধু চেয়েছিল সন্তানদের জন্য একটু নিরাপদ ভবিষ্যৎ। আজ স্বামী কোথায় আছে জানে না, কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা দুটি মুখ তাকে জানিয়ে দেয়— অপেক্ষা এখনও বেঁচে আছে।
একদিন ছেলে হঠাৎ বলল, ‘মা, বাবা কি আমাদের পছন্দ করে না?’
প্রশ্নটা তীরের মতো এসে বিঁধল রোকেয়ার বুকে। সে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বাবা তোকে খুব ভালোবাসে।’
এই প্রথম সে মিথ্যে বলল। কিন্তু এই মিথ্যেটুকুই কি তার সন্তানের ভাঙা হৃদয় বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়? সেদিন গভীর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজের সেজদায় মাথা রেখে রোকেয়া কাঁদে। প্রার্থনা করে, ‘হে আল্লাহ, আমার সন্তানদের যেন কোনোদিন মাথা নিচু করে বলতে না হয়, বাবা আমাদের ফেলে চলে গেছে। ওদের মানুষ করার শক্তিটুকু আমাকে দাও।’
পরদিন ভোরে সে সিদ্ধান্ত নেয়— কাজ শুরু করবে। সন্তানদের হাত ধরে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ফিরতে ফিরতে ভাবে, পরিচয় একদিন ওরা নিজেরাই বানাবে। বাবার অনুপস্থিতি নয়, মায়ের দৃঢ়তা হবে তাদের পরিচয়। দরজাটা এখনও খোলা থাকে সন্ধ্যায়। হয়তো কেউ ফিরবে না। তবু রোকেয়া জানে— অপেক্ষা শুধু কারও জন্য নয়, নিজের শক্ত হয়ে ওঠার জন্যও।
এফআর