নানাবিধ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় বাঙালির প্রাণের উৎসব অমর একুশে গ্রন্থমেলা। নবনির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবারের বইমেলা উদ্বোধন করেন। এরপর বিকালে সর্বসাধারণের জন্য মেলার দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’।
মেলা শুরু হতেই দেখতে দেখতে যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগামী ১৫ মার্চ বইমেলার পর্দা নামবে। কিন্তু হতাশার সুর বেজে উঠেছে শুরু থেকেই। পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের কারণে খুব বেশি জমে ওঠেনি বইমেলা। মেলার প্রতিদিনের চিত্র যেন তা-ই বলছে। ফলে অলস সময় কাটান স্টলের কর্মীরা। প্রকাশকদের মনেও তেমন উচ্ছ্বাস নেই। লেখকদের ভেতরেও তেমন আগ্রহ লক্ষ করা যায়নি।
শুধু তা-ই নয়, বইমেলায় এবার প্রত্যাশার তুলনায় পাঠক সমাগম কম থাকায় হতাশ হয়েছেন প্রকাশক ও লেখকরা।
প্রতিদিন বিকালের পর কিছুটা ভিড় বাড়লেও সারা দিনজুড়ে অনেক স্টলে দেখা যায় ক্রেতাদের ভিড় তেমন নেই। প্রকাশকদের ভাষ্য অনুযায়ী মেলায় দর্শনার্থী থাকলেও বই বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি তোলা ও আড্ডায় ব্যস্ত তরুণদের উপস্থিতি চোখে পড়লেও বই কেনার আগ্রহ তুলনামূলক কম। অনেক স্টলে বিক্রেতাদের অলস সময় কাটাতে দেখা যায়। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, কেউবা বসে আড্ডা দিচ্ছেন অন্য স্টলকর্মীর সঙ্গে।
একাধিক প্রকাশক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বইমেলার নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তনে পাঠকের আগ্রহে ভাটা পড়েছে। তাদের দাবি, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে মেলা শুরু না হওয়ায় ঐতিহ্যগত আবহ কিছুটা নষ্ট হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিক্রিতে। অনেকেই ঘুরতে এলেও বাজেট ও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব বই কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
এবারের বইমেলা রমজান মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিকালের দিকে দর্শনার্থীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। বিশেষ করে ইফতারের আগের সময়টায় মেলা প্রাঙ্গণে স্বাভাবিক দিনের মতো ভিড় লক্ষ করা যায়নি। দুপুরের পর থেকে মেলায় মানুষের উপস্থিতি থাকে সীমিত। বেশ কিছু স্টলে বিক্রেতাদের বসে থাকতে দেখা যায়। তবে বিকালের শেষ ভাগে এবং সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীর সংখ্যা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কিছুটা চোখে পড়ার মতো।
দলবেঁধে বিভিন্ন স্টল ঘুরে বই দেখা, নতুন প্রকাশনা খোঁজা এবং ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় তাদের। কেনাকাটায় আগ্রহ চোখে পড়ে। ইফতারের আগে মানুষ সময় পেলে চলে যাচ্ছে ঈদের কেনাকাটা করতে। ঈদের বাজারে যে উপস্থিতি চোখে পড়ছে, তাতে বইমেলা জনশূন্য হওয়া স্বাভাবিক।
৬ মার্চ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা গেল, জনপ্রিয় তরুণ লেখক সাদাত হোসাইনের স্টলে আশানুরূপ ভিড়। এবার তার নতুন বই ‘নীলকণ্ঠী’ এসেছে। বইটির জন্য তার পাঠক ও ভক্তরা হাজির হয়েছেন। তবে তা অন্যান্য বছরের তুলনায় কমই বলা যায়। এ ছাড়া এবার সোশ্যাল মিডিয়ায়ও নতুন বই নিয়ে তেমন আলোচনা চোখে পড়ছে না। প্রিয় লেখকের সঙ্গে সেলফি, বই নিয়ে আলোচনা কিংবা মেলার মাঠে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতাও এবার কম। কনটেন্ট বানিয়ে বিভিন্ন সময় ভাইরাল হওয়া লোকদের বইও এবারের মেলায় কম এসেছে বলে মনে হচ্ছে।
এবার বইমেলা ঘিরে হইচই নেই মুশতাক-তিশা, ডা. সাবরিনা কিংবা টিপু সুলতানদের ঘিরে। ফলে বলা যায়, এবার যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা হচ্ছে, এটিই হয়তো অনেকের জন্য আশাপ্রদ।
মেলায় দায়িত্বে থাকা কয়েকজন বিক্রেতা গণমাধ্যমকে জানান, রোজার কারণে দিনে বিকালের বিক্রি কিছুটা ধীরগতির থাকলেও শুক্রবার পরিস্থিতি ভিন্ন থাকে। ছুটির দিন হওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে এবং বিক্রিও সন্তোষজনক হয়েছে। বিশেষ করে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্টলে ক্রেতাদের ভিড় ছিল বেশি। দিনের বেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীর সমাগম তুলনামূলক কম। বিকালের পর কিছুটা ভিড় বাড়ছে। বিকাল নামার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। সন্ধ্যায় কোথাও কোথাও বেশ ভিড় লক্ষ করা যায়।
রমজান মাস চলার কারণে অনেকেই পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারের পর মেলায় আসছেন। বিশেষত সন্ধ্যায় তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
রমজান ও আসন্ন ঈদ উপলক্ষে মানুষ মার্কেটমুখী হওয়ায় বই বিক্রিতে ভাটা পড়েছে বলে মনে করছেন বিক্রেতারা। অনেকে পরিবার নিয়ে ইফতারের আগে সময় কাটাতে মেলায় আসছেন। তবে বাজেটের বড় অংশ ঈদের কেনাকাটায় ব্যয় হওয়ায় বই কেনার আগ্রহ কমেছে।
রোজার দিনে বিকালে বের হওয়া অনেকের জন্যই কষ্টকর। তাই ইফতারের পর একটু সময় করে আসেন কেউ কেউ। পরিবেশটা তখন বেশি প্রাণবন্ত লাগে। বইমেলায় সাধারণত শখের পাঠকরা এসে অন্তত দুয়েকটি বই কিনে থাকেন। কিন্তু এবার রমজানের কারণে সেই ক্রেতাদের সংখ্যাও কমে গেছে। পুরো বিকাল বসে বসে কাটাতে হচ্ছে স্টলকর্মীদের। মাঝেমধ্যে কেউ আসেন, বই উল্টেপাল্টে দেখে চলে যান।
দুপুরবেলা মেলার মাঠে প্রবেশ করলে মনে হয় মেলার পরিবেশ অনুপস্থিত। দুই স্টলের মাঝে কোনো জনমানবের চিহ্নও পাওয়া যায় না। স্টলের কর্মীরা নিশ্চুপ বসে থাকেন মন খারাপ করে। এমন নিষ্প্রাণ বইমেলা এর আগে হয়তো দেখেননি তারা। করোনাকালে যেমন আতঙ্ক বিরাজ করত; তেমন নির্জনতা বিরাজ করছে এখন।
তবে আশার খবর হলো, ইনকিলাব মঞ্চের স্টলে মানুষের সমাগম চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে বিদ্যানন্দ প্রকাশনী ব্যতিক্রম স্টল নির্মাণ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কিছুটা প্রাণ ফিরে পায় অমর একুশে গ্রন্থমেলা। সকালের শিশুপ্রহরে শিশুদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে শিশু চত্বর। অন্যদিকে লিটল ম্যাগ চত্বর বরাবরই নিষ্প্রাণ। ফলে শুক্র-শনিবারের ভিড়ের বাইরে এবার উৎসবের তেমন আমেজ নেই। নেই বিশেষ কোনো দিন। অন্যান্য বছর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে বইমেলা জমে উঠত। এবার তেমন কোনো সুযোগ নেই। ভরসা শুধু শুক্র ও শনিবার।
তবে ছুটির দিন ছাড়া অন্য দিনে মেলায় আগত ক্রেতার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিভিন্ন প্রকাশনীর বিক্রেতারা। বিকালের পর থেকে স্টলগুলোতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি কিছুটা বাড়তে শুরু করে।
পরিবার-পরিজন, শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতিতে অনেক স্টলেই বই দেখা ও কেনাকাটার ভিড় দেখা যায়। সন্ধ্যার দিকে সেই ভিড় আরও বাড়তে থাকে। তবে বিক্রেতাদের ভাষ্য হলো, ছুটির দিনে তুলনামূলক ভালো বিক্রি হলেও সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে।
প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি বইমেলা শুরু হলেও এবার জাতীয় নির্বাচনের কারণে তা অনেকটাই পিছিয়েছে। রমজান ও ঈদুল ফিতর ঘিরে ব্যবসায়িক ক্ষতির শঙ্কায় মেলায় অংশ নেওয়া ঘিরে প্রকাশকদের মধ্যে দ্বিধা ছিল। তবে স্টল ভাড়া শতভাগ মওকুফসহ বেশ কিছু দাবি পূরণ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো মেলায় অংশ নিতে রাজি হয়। ভাষার মাসজুড়ে মেলার অন্যরকম আমেজ থাকে। কিন্তু এবার সেটি নেই। মেলা শুরুই হয়েছে ফেব্রুয়ারির শেষ ভাগে।
এ সময়ে রমজান চলছে। সামনে ঈদ। ফলে অনেকে ইচ্ছে থাকলেও হয়তো মেলায় আসতে পারছেন না। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার ব্যবসায় মন্দার আভাস পাচ্ছেন তারা। অনেক প্রকাশনী আবার লোকসানের ভয়ে বইমেলায় অংশগ্রহণ করেননি। তাদের দাবি ছিল, ঈদুল ফিতরের পরে বইমেলা অনুষ্ঠিত হোক।
আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণ করছে ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রকাশনার স্টল বসেছে। মোট ইউনিট
রয়েছে ১ হাজার ১৮টি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে স্টল বরাদ্দ পেয়েছে ৮৭টি লিটল ম্যাগ।
এবারই হয়তো প্রথম কোনো বইমেলায় প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করা হয়নি। কেননা বইমেলা জমে ওঠার ব্যাপারে শুরু থেকেই আশঙ্কা ছিল সবার মধ্যে। জেনেশুনেই তারা মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন। নবনির্বাচিত সরকার জেনেশুনেই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছে। এখন সামনের দিনগুলো দেখার অপেক্ষা।
এফআর