ইসলামি অর্থব্যবস্থায় সম্পদের সুষম বণ্টনের লক্ষ্যে জাকাত ও ফিতরার প্রচলন করা হয়েছে। যাতে ধন-সম্পদ শুধু ধনীদের মধ্যে ঘুরপাক না খায়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমাদের (ধনীদের) সম্পদে রয়েছে অভাবী ও বঞ্চিতদের অধিকার’ (সুরা জারিআত, আয়াত : ১৯)। আমরা সহিহ হাদিস থেকে জানতে পারি, পবিত্র রমজানে এক টাকা দানে সত্তরের অধিক টাকা দানের সওয়াব পাওয়া যায়। তাই জাকাত, সদকা (দান) ও ফিতরা প্রদানের উত্তম সময় নিঃসন্দেহে এই রমজান মাস। ইসলামে জাকাত কে দেবে, কে পাবে, কোন কোন খাতে ব্যয় হবে ইত্যাদি সব সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। জাকাত দানকারীর সম্পদের নিসাব (নির্ধারিত পরিমাণ) হলো ৭ তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসা পণ্য যদি বছরান্তে অবশিষ্ট থাকে, তবে তার সম্পদের শতকরা আড়াই শতাংশ হিসাবে আল্লাহর নির্ধারিত খাতে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করতে হয়।
জাকাত-ফিতরা আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, ‘আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে। সুতরাং আমি তা লিখে দেব তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং জাকাত প্রদান করে। আর যারা আমার আয়াতের প্রতি ঈমান আনে’ (সুরা আরাফ : ১৫৬)। আল্লাহর রহমত দুনিয়ায় সবার সঙ্গে থাকে। নেককার, বদকার নির্বিশেষে সবাই এ রহমত থেকে উপকৃত হয়। কিন্তু আখেরাতে এ রহমতের অধিকারী হবে কেবল মুত্তাকিরা, যেমনটা আয়াতে বিবৃত হলো। আর মুত্তাকিদের একটা গুণ ও বিশেষ পরিচয় হলো তারা জাকাত আদায় করে। এ আয়াতটি দ্বারাও জাকাতের গুরুত্ব পরিপূর্ণ স্পষ্ট হয়। জাকাতের মাধ্যমে সম্পদ বাড়ে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের ধন-সম্পদে তোমাদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এ আশায় তোমরা সুদে যা কিছু দাও, আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা জাকাত দিয়ে থাকে, অতএব, তারাই দ্বিগুণ লাভ করে’ (সুরা রুম : ৩৯)। আয়াতটিতে সুদ ও জাকাতের মাঝে তুলনা করা হয়েছে। উভয়টির মধ্যে পার্থক্য বয়ান করা হয়েছে, সুদ দ্বারা বাহ্যিকভাবে সম্পদ বৃদ্ধি পায়; কিন্তু আল্লাহ তায়ালার এখানে এমন সম্পদের কোনো কদর নেই। পক্ষান্তরে জাকাত যেটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দেওয়া হয়, বাহ্যত এতে নিজের সম্পদ কমে যায়; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এদের সম্পদ আল্লাহর কাছে বাড়ে এবং কেয়ামতের দিন যখন ঈমানদাররা নিজেদের সম্পদের সওয়াব দেখতে পাবে তখন তাদের আনন্দ দিগুণ হয়ে যাবে।
ইসলামে জাকাত আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রমজান মাসই জাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময়। ফলে এ সময় বিত্তবানরা দান-সদকা ও জাকাত-ফিতরা প্রদানে উৎসাহিত হন। জাকাত প্রদানের ফলে ধনী-গরিবের মাঝে পারস্পারিক ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। তাই নবী করিম (সা.) যথার্থই বলেছেন, ‘জাকাত ইসলামের সেতু’ (মুসলিম)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি বস্তুর একটি জাকাত রয়েছে, আর মানুষের দেহের জাকাত হলো সাওম’ (ইবনে মাজা)। আর জাকাত আদায়ে সম্পদ পবিত্র হয়। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদের জাকাত প্রদান করে, তার সম্পদের দোষ দূর হয়’ (মেশকাত)। জাকাত আদায় করলে সম্পদ বৃদ্ধি পায়। ধনী লোকেরা যদি ঠিকমতো জাকাত আদায় করেন, তা হলে সমাজে কোনো অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয়হীন, শিক্ষাহীন লোক থাকতে পারে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি জাকাত আদায় করে, তখন ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করে।’ (মেশকাত)
পবিত্র মাহে রমজানে প্রদেয় আরেকটি আমল হচ্ছে ফিতরা। ঈদের সালাতের আগেই ফিতরা আদায় করা নিয়ম। রাসুল (সা.) লোকজন ঈদের নামাজের উদ্দেশে বের হওয়ার আগে সাদকাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন (বুখারি, হাদিস : ১৫০৯)। অবশ্য কোনো কোনো সাহাবি থেকে ঈদের কয়েক দিন আগেও ফিতরা আদায়ের কথা প্রমাণিত আছে। নাফে (রহ.) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদের দুয়েক দিন আগেই ফিতরা আদায় করে দিতেন (আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৬)। সুতরাং ফিতরা রমজানের মধ্যে আদায় করলে অতিরিক্ত সওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়। এতে গরিব, অসহায় মানুষরা ঈদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে পারেন সানন্দে। রোজা রাখতে গিয়ে যেসব ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে তা থেকে মুক্ত হতে ঈদের দিন সুবহে সাদেকের পর ঈদের নামাজের আগে সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব।
সহিহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী ২ পরিমাপে ৫ জিনিস দিয়ে ফিতরা আদায় করা যায়। আর তা হলো গম, যব, কিশমিশ, খেজুর, পনির। এগুলোর মধ্যে গমের পরিমাপ হলো অর্ধ সা আর বাকিগুলোর পরিমাপ এক সা। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো একটি দিয়ে এ ফিতরা আদায় করতে পারবেন। পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন কোনো স্বাধীন মুসলমানের কাছে জাকাতের নিসাব তথা সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ কিংবা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ কারও কাছে থাকলেই ওই ব্যক্তির জন্য ফিতরা ওয়াজিব। বাড়ি-ঘর, আসবাবপত্র, স্থাবর সম্পদের মূল্য (যদি ব্যবসার জন্য না হয়) জাকাতের নিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আসবাবপত্র, ঘর-বাড়ি ও স্থাবর সম্পদ, ভাড়া বাড়ি, মেশিনারিজ, কৃষিযন্ত্র ইত্যাদি (উপার্জনের জন্য না হলেও) এসবের মূল্যের হিসাবও ফিতরার নেসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। মহান আল্লাহ আমাদের প্রত্যেক ‘সাহেবে নেসাব’কে (নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদের মালিক) জাকাত ও ফিতরা আদায়ের তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/এনএ