ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান নদীর পাড়ে পুরোনো রাস্তার দুই পাশে ৪ কিলোমিটার এলাকায় সম্প্রতি অনুমোদনের পর ১৮১৫টি গাছ কাটতে শুরু করে বন বিভাগ। দরপত্রের দ্বারা ঠিকাদারদের মাধ্যমে গত এক সপ্তাহে অতি মূল্যবান ১২০টি গাছ কেটেছে বন বিভাগ।
প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দফতরে চিঠি লিখে গাছ কাটা বন্ধের অনুরোধ জানান পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক ইসমাঈল মুসাফির। তার সঙ্গে সহমত পোষণ করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়রাম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ উচ্চ আদালতে দেওয়া গাছ কাটা বিষয়ে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি আসিফ হাসানের একটি রায়ের কথা ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিনকে জানান।
গাছ কাটা এখনও চলছে এমন তথ্য জেলা প্রশাসককে বৃহস্পতিবার দুপুরে আবারও জানালে তিনি গাছ কাটা বন্ধ করতে জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকিরুল হক সরকারকে নির্দেশ দেন।
সরজমিনে দেখা যায়, গাবখান নদীর পাড়ে ব্লক ফেলতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প চলমান। নদীর পাড়েই পুরোনো এবং নতুন দুটি রাস্তা। গাবখান বাজার থেকে বারুহাট পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এলাকায় পুরোনো রাস্তাটি থেকে নদীর পানি পর্যন্ত শুকনো পাড় গড়ে ২০ ফুটের (শীতের মৌসুমে) বেশি। কোথাও পাড়ের জায়গা এর চেয়ে দ্বিগুণ। অনেক জায়গায় জিও ব্যাগ পর্যন্ত পাড় ৫০ ফুটেরও বেশি। পাড়ে এত জায়গা থাকার পরও উঁচু পুরান রাস্তাটিতেও ব্লক ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ ছাড়া তাদের পরিকল্পনায় আছে পুরান রাস্তার দুই পাড়ে থাকা হাজার-হাজার গাছ কাটার নির্দেশনা। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী দেড় বছর ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে গাছ কাটতে বলার পরে কয়েক দফা মিটিংয়ের পরে কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা প্রশাসক গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী ৪৭টি লটে ১৮১৫টি গাছ কাটার জন্য বন বিভাগ চিহ্নিত করে। এর আগে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদারদের কাছে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বন বিভাগ থেকে পাওয়া নথিতে দেখা যায় একেক লটে গড়ে ৪০টি করে গাছ রাখা হয়েছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে একেকটি লটে ৫০টি করে গাছ কাটা হবে। সেই হিসাব মতে অন্তত ২৩৫০টি গাছ কাটা পড়বে।
আরও পড়ুন
এ বিষয়ে পরিবেশকর্মী ও ঝালকাঠির সিনিয়র আইনজীবী নাসির উদ্দীন কবীর বলেন, সংখ্যাটি দুই হাজারের বেশি হোক বা প্রায় দুই হাজার হোক- কিন্তু এতসংখ্যক গাছ কাটার চিন্তা একজন ইঞ্জিনিয়ারের মাথায় আসে কীভাবে? যেকোনো মূল্যে সামাজিক বনায়ন রক্ষা করতে হবে। ওখানে কমপক্ষে ১০০ প্রজাতির পাখি আছে। সরীসৃপ প্রাণীর মধ্যে বিরল আকারের অসংখ্য গুইসাপ আছে। এই জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে কোনোভাবেই এই গাছ কাটতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে সবরকম আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী ১৮০০ এর বেশি গাছের মধ্যে মাত্র ৮০০ গাছের হিসাব বিশ্লেষণ করেই মিলেছে ২৬ প্রজাতির গাছ। যার মধ্যে রয়েছে রাজ কড়াই ২৪, কাঞ্চন ১৬, তুলা ৬৮, অর্জুন ১৮৯, শিশু ৯৭, বাবলা ৭, তেঁতুল ১৩, জারুল ৪৩, কড়ই ১২, জাম ৬, নিম ৩৯, কাঁঠাল ১১, গামার ১২, সেগুন ১৫ ও ২টি উড়ি আমসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। ১৮০০ এর বেশি গাছ বিশ্লেষণ করলে অর্জুন, শিশু, তুলা ও নিমসহ সব গাছের সংখ্যাই দ্বিগুণ হবে।
বন বিভাগ সূত্রের তথ্য মতে, এই ৪৭টি লটের মধ্যে ৩৭টি লটই কাটার ঠিকাদারি পেয়েছিলেন ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার নজরুল মেম্বারসহ ৪ জন ঠিকাদার। বাকি ১০টি লট পেয়েছিলেন ঝালকাঠি সদর ও কাঁঠালিয়ার ৩ জন ঠিকাদার। ১৮১৫টি গাছের বিনিময় মূল্য উঠেছিল ৬০ লাখ টাকা। ঝালকাঠি জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকিরুল হক সরকার জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা প্রশাসক স্যার নির্দেশ দেওয়ার পরে গাছ কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি বলা ছাড়া কেউ একটা ডালও কাটতে পারবে না। গাছের প্রতি বন বিভাগের মায়াই সবচেয়ে বেশি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড গত দেড় বছর ধরে বলার পরে কমিটিতে পাস করিয়ে এই গাছ কাটতে আমরা বাধ্য হয়েছি। ব্লক ফেললে গাছ এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ সাহেব উচ্চ আদালতের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। গাছ কাটার যখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল তখন এই রায়টি হয়নি। এখন গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি। এত গাছ আর কাটতে দেওয়া হবে না। সামনের মিটিংয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সিনিয়র আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মনজিল মোরশেদ বলেন, উচ্চ আদালতের রায় আছে- এভাবে এই গাছ কাটতেই পারবে না। পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ কমিটি করে সেই কমিটির নির্দেশনা ছাড়া গাছ কাটা যাবে না।
এএডি/