রমজানে রাতের বিশেষ নামাজ তারাবিহ। এ ছাড়া নবীজি (সা.) রমজানে বিশেষ মর্যাদায় তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার আগে নবীজি (সা.)-এর ওপর তাহাজ্জুদ ফরজ ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হলে তাহাজ্জুদের ফরজিয়াত বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে নবীজি (সা.) ইন্তেকাল পর্যন্ত এই নামাজ নিয়মিতভাবে আদায় করেছিলেন। এ ধারাবাহিকতায় তাহাজ্জুদের বিধান এখনও সুন্নত হিসেবে বহাল আছে। তাহাজ্জুদ নামাজ অত্যন্ত বরকত ও ফজিলতপূর্ণ। তাহাজ্জুদের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন এবং নৈকট্য লাভ করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে রাসুল। আপনি রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ পড়ুন। এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব। আশা করা যায় আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৭৯)
আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতের মাধ্যমে নবীজি (সা.)-এর ওপর তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করার বিধান নাজিল করেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার আগে সুরা মুজ্জাম্মিলের প্রথম আয়াতাংশের দ্বারা তাহাজ্জুদের নামাজ নবীজি (সা.)-এর ওপর ফরজ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়, তখন তাহাজ্জুদের নামাজের ফরজিয়াত বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে অতিরিক্ত হিসেবে আদায় করার বিধান ছিল, যা এখনও আছে এবং উম্মতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নফল নামাজ হিসেবে কেয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। নবীজি (সা.) তাহাজ্জুদের নামাজে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতেন।
চলছে রমজানের শেষ দশক। অনেকে মসজিদে ইতিকাফে আছেন। রমজানের বাকি দিনগুলোতে সেহরির সময়ে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া জরুরি। কারণ হাদিসে এসেছে, হজরত মুগিরা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদের নামাজে এত দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়ালেন যে, তার পাদ্বয় ফুলে গেল।
যখন তাকে বলা হলো, আপনি এরূপ কেন করেন? আল্লাহ তায়ালা তো আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হব না’ (মুসলিম ১১৪৯)। নবীজি (সা.) তাহাজ্জুদ নামাজ নিয়মিত আদায় করতেন। কোনো কারণে তিনি এই নামাজ আদায় করতে না পারলে ফজর ও জোহরের মধ্যবর্তী সময়ে এর পরিবর্তে বারো রাকাত নামাজ পড়ে নিতেন। হাদিসে এসেছে, হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সা.) ব্যথা বা অন্য কোনো কারণে যদি তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতে না পারতেন, তবে তিনি দিনে বারো রাকাত নামাজ আদায় করে নিতেন (মুসলিম ১৬৪০)। এ ছাড়া তাহাজ্জদের আরও অনেক ফজিলত বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা রাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজকে আবশ্যক করে নেবে। কেননা এটা হচ্ছে তোমাদের আগের সৎলোকের নিয়ম। তোমাদের জন্য প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের পথ, গুনাহ মাফের উপায় এবং অপরাধ থেকে বাধাদানকারী।’ (তিরমিজি ৩৫৪৯)
নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির ওপর আল্লাহ খুখি হন, যখন সে রাতে (তাহাজ্জুদের) নামাজ আদায় করার জন্য ওঠে, মুসল্লিরা যখন নামাজের জন্য কাতার বাঁধে এবং সৈন্যদল যখন শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সারিবদ্ধ হয়’ (শরহুস সুন্নাহ ১১৫৭)। হাদিসের আলোকে এ কথা প্রমাণিত, তাহাজ্জুদ নামাজ আগের সৎলোকের তথা মুত্তাকিদের নিদর্শন এবং এর মাধ্যমে গুনাহ মাফের কারণ হয়। ভবিষ্যতে তাদের আল্লাহর পক্ষ থেকে গুনাহমুক্ত থাকার বিশেষ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং নৈকট্য লাভ করা যায়। রমজান মাস বান্দার জন্য শ্রেষ্ঠ একটি মাস।
এই মহিমান্বিত মাসের শেষ দশক আরও গুরুত্বপূর্ণ। এ মাসের ইবাদত-বন্দেগির সওয়াব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্য মাসের তাহাজ্জুদ নামাজ আর রমজান মাসের তাহাজ্জুদেরে নামাজের মধ্যে বিস্তর ফারাক।
রমজানে নফল নামাজ আদায় করলে অন্য মাসের ফরজের সমতুল্য সওয়াব। আর রমজান মাসে রোজাদাররা যেহেতু সেহরি গ্রহণ করার জন্য উঠেন, একটু আগেভাগেই উঠে এই ফজিলতপূর্ণ নামাজ আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং ক্ষমা প্রার্থনার সুবর্ণ সুযোগকে কাজ লাগিয়ে অশেষ কল্যাণ লাভ করতে পারেন। ফরজ নামাজ যেমন পাঁচ ওয়াক্ত আদায় করে ৫০ ওয়াক্তের সওয়াব পাওয়া যায়, অনুরূপ তাহাজ্জুদ নফল বা সুন্নত হলেও এতে ফরজের সমতুল্য সওয়াব পাওয়া যায়। নফল নামাজের ক্ষেত্রে দিনের চেয়ে রাতে সওয়াব বেশি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সময়ের আলো/এনএ