মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্যের স্মারক ও আভিজাত্যের প্রতীক হলো টুপি। আর সেই টুপি তৈরিতেই এখন দেশজুড়ে সুনাম কুড়াচ্ছে উত্তরের সীমান্তঘেঁষা উপজেলা তেঁতুলিয়া।
পঞ্চগড়ের এই উপজেলার মাথাফাটা গ্রামের কারিগরদের আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এখন দম ফেলার সময় নেই। গত দেড় যুগের বেশি সময় ধরে এলাকাটি পরিচিতি পেয়েছে ‘টুপিপল্লি’ হিসেবে।
এখানকার তৈরি টুপি এখন শুধু দেশের বাজারে নয়, বরং মান ও নান্দনিকতায় জয় করেছে বিদেশের বাজারও।
সরেজমিনে মাথাফাটা গ্রামের ‘মেসার্স আল ইকরা ক্যাপ ইন্ডাস্ট্রিজ’ ঘুরে দেখা যায়, দিনরাত এক করে কাজ করছেন কারিগররা। ঈদ উপলক্ষ্যে পাঞ্জাবি-পায়জামার সঙ্গে নতুন টুপির চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যস্ততার মাত্রা বেড়েছে।
এক সময় হাতে চালানো ছোট মেশিনে টুপি তৈরি হলেও এখন বড় কম্পিউটারাইজড মেশিনে একসঙ্গে ১৫টি টুপি তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি টুপির একেকটি অংশে কারিগররা তাদের নিপুণ হাতের কাজ ফুটিয়ে তুলছেন।
দিনে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি টুপি তৈরি হচ্ছে এই কারখানায়।
এই কারখানায় তৈরি টুপির মূল ক্রেতা রাজধানী ঢাকা ও বিভাগীয় শহরের পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এছাড়া যশোর, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শপিং মলে এখানকার টুপি সরবরাহ করা হয়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তেঁতুলিয়ার টুপি এখন পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং জাপানের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে।
মান ও নকশার ভিন্নতায় প্রতিটি টুপি ১০০ থেকে শুরু করে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
কারখানায় টুপি কিনতে আসা জিতু ও বিপু নামের দুই ক্রেতা জানান, সামনে ঈদ আর ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদের নামাজে নতুন পাঞ্জাবির সাথে বাহারি রঙের টুপি কিনতে এখানে ছুটে এসেছি। পছন্দ মতো কিনে নিব।
টুপি শিল্পকে কেন্দ্র করে এই গ্রামের অনেক বেকার যুবক ও দুস্থ নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে।
কারখানায় কাজ করা আনোয়ারা পারভীন জানায়, টুপি তৈরির সাথে জড়িত রয়েছি ২০০৮ সালে। টুপি কারখানায় কাজ করে মাস শেষে মজুরি পাওয়া অর্থে পরিবারের অনেক উপকার হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কারখানার মালিক হারুন উর রশিদ জানান, বর্তমানে তার কারখানায় ১৮ জন শ্রমিক সরাসরি কাজ করছেন। পুরুষ শ্রমিকেরা কারখানায় কাজ করলেও অনেক নারী শ্রমিক ঘরকন্যার কাজের ফাঁকে টুপির নকশা ও হাতের কাজ করছেন।
কারখানার শ্রমিক লতিফ ও হাসান জানান, এক সময় কাজের সন্ধানে তাদের ঢাকায় থাকতে হতো। কিন্তু এখন বাড়ির কাছেই সম্মানজনক বেতন ও নিরিবিলি পরিবেশে কাজ করতে পারছেন। যারা দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করেন, তারা মাসে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
আর নারীরা দিনে ৪-৫ ঘণ্টা কাজ করে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করে সংসারে সচ্ছলতা আনছেন বলেও জানান তারা।
কারিগরদের সাফল্য থাকলেও পথে রয়েছে কিছু কাঁটা।
কারখানার মালিক হারুন উর রশিদ বলেন, করোনা মহামারির ধাক্কায় এই এলাকায় অনেকগুলো কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কাঁচামাল যেমন সুতা, কাপড় ও জরির দাম অনেক বেড়ে গেছে।
এছাড়া চীন থেকে আমদানিকৃত কম দামি টুপির সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বলেও জানান।
উত্তরের এ প্রান্তিক উপজেলায় ভারি কোন শিল্প কারখানা না থাকলেও ‘টুপিপল্লি’ আজ এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছে।
প্রান্তিক মানুষের শ্রম আর কারিগরি দক্ষতায় তৈরি এই টুপি শুধু ধর্মীয় রীতিই নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সরকারি সুনজর পেলে তেঁতুলিয়ার এই রাজকীয় টুপি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে এই শিল্প আরও সম্প্রসারিত হতো এবং আরও মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব হতো এমনটি মনে করছেন কারখানার মালিক হারুণ অর রশিদসহ এলাকার অনেকেই।
সময়ের আলো/আরবিএন