চট্টগ্রামের মূল নগরী থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘ চার দশক ধরে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অপরাধ সাম্রাজ্য। সরকারি খাস জমি দখল, পাহাড় কেটে প্লট তৈরি, হাজার কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য এবং সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল— সব মিলিয়ে এলাকাটি যেন ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’।
প্রশাসনের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে এখানে কায়েম হয়েছে পাহাড় ধ্বংস ও দখল বাণিজ্যের অঘোষিত রাজত্ব।
পাহাড়ের বুক চিরে প্লট বাণিজ্যের সূচনা : জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় ধ্বংসের ইতিহাস শুরু প্রায় চার দশক আগে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নব্বই দশকে আলী আক্কাস নামে এক বন প্রহরীর হাত ধরে প্রথম পাহাড় দখল ও প্লট বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়। বনের রক্ষক যখন ভক্ষকে পরিণত হন, তখন থেকেই সবুজ অরণ্যের পতনের সূচনা ঘটে।
আলী আক্কাস পাহাড় কেটে ছিন্নমূল মানুষের কাছে প্লট বিক্রি শুরু করেন। পরে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হলেও তার তৈরি করা ‘মডেল’ বন্ধ হয়নি; বরং তা আরও বিস্তৃত রূপ নেয়।
পরবর্তী সময়ে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ ভাগ হয়ে যায় কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার এবং গাজী সাদেকের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে। গত এক দশকে ইয়াসিন মিয়া কার্যত পুরো এলাকাটির অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হন। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’।
অন্যদিকে ‘আলীনগর সমবায় সমিতি’র ব্যানারেও পাহাড় কেটে প্লট তৈরির কার্যক্রম চলতে থাকে।
হাজার কোটি টাকার প্লট সাম্রাজ্য : ভূমি অফিসের জরিপ ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় অন্তত ৩৭টি বড় পাহাড় সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কেটে ফেলা হয়েছে।
এর মধ্যে ছিন্নমূল এলাকায় ৩৩টি পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৯০০টি প্লট। আর আলীনগর এলাকায় ৩টি বড় পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার প্লট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিটি প্লট ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়েছে। সাধারণ ৫০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে দলিলসদৃশ কাগজ তৈরি করে এই লেনদেন চলত। সব মিলিয়ে এ অবৈধ বাণিজ্যের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
পাহাড় কাটার ‘টোকেন রাজত্ব’ : এই এলাকায় পাহাড় ধ্বংসের জন্য চালু করা হয়েছিল এক অভিনব ‘টোকেন পদ্ধতি’। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করলে যে কেউ পাহাড় কাটার অনুমতি পেত।
আর পাহাড় কাটার পর মাটি বিক্রি, ঘর তৈরির নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ, পানির অবৈধ সংযোগ— এসব খাত থেকেও প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা আয় করেছে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট।
অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল : জঙ্গল সলিমপুর শুধু ভূমিদস্যুতার কেন্দ্র নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবেও পরিচিত। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে পাহাড়ের প্রবেশপথে সশস্ত্র পাহারা বসানো হতো। প্রশাসনের গতিবিধি নজরদারির জন্য পাহাড়ের চূড়ায় বসানো হয়েছিল উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসি ক্যামেরা ক্যামেরা এবং ওয়াচ টাওয়ার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফেরারি আসামি, মাদক ব্যবসায়ী এবং অস্ত্রধারীরা এখানে মাসোহারা দিয়ে আত্মগোপনে থাকত।
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয় : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের ক্ষমতার ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসে। এতদিন ইয়াসিন মিয়ার একক আধিপত্য থাকলেও পরে রোকন মেম্বারের নেতৃত্বে নতুন একটি সশস্ত্র বাহিনী আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, মাটি বিক্রি এবং মাসোহারা আদায়কে কেন্দ্র করে সংঘাত তীব্র হয়েছে। গত দুই বছরে এই দ্বন্দ্বে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন।
বিভিন্ন থানা সূত্রে জানা যায়, ইয়াসিন মিয়ার বিরুদ্ধে ২১টি, রোকন মেম্বারের বিরুদ্ধে ২৮টি, কাজী মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে ২৭টি, নুরুল হক ভাণ্ডারীর বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। এসব মামলা সীতাকুণ্ড, আকবরশাহ এবং বায়েজিদ বোস্তামী থানায় দায়ের করা হয়েছে। তবে দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল অর্থের প্রভাবে তারা দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছে।
পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি : এক সময় জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়গুলোকে চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ বলা হতো। এখন সেখানে দেখা যায় ধু ধু বিরানভূমি অথবা অপরিকল্পিত টিনের বসতি। পাহাড় কেটে ফেলার ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা বেড়েছে, পাহাড় ধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, গত চার দশকে জঙ্গল সলিমপুরে যে পরিমাণ পাহাড় কাটা হয়েছে, তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।
আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা, পরিবেশবাদীদের আলটিমেটাম : ২০১২ সালে হাইকোর্ট চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও জঙ্গল সলিমপুরে তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়নি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাম এবং সৃষ্টি— এই তিন সংগঠন সরকারের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে একটি তাগাদা নোটিস পাঠিয়েছে।
নোটিসে বলা হয়, ২০১১ সালে দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার রায়ের পরও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
বেলার নেটওয়ার্ক মেম্বার আলীউর রহমান বলেন, ‘নগরীর অদূরে জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসী ও দখলদারদের অভয়ারণ্য হয়ে ওঠা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আদালত অবমাননার মামলাসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
পরিবেশবাদীরা অবিলম্বে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পাহাড়ে দেশীয় বৃক্ষরোপণ, স্থায়ী নজরদারি সেল গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
প্রশাসনের অভিযান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ একে ‘বড় সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভূমিদস্যুরা সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। এখন তাদের নেপথ্যের কারিগরদের আইনের আওতায় আনার সময় এসেছে।
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান জানান, অভিযান কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম ধাপে এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে; দ্বিতীয় ধাপে অপরাধীদের গ্রেফতার এবং স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানান, উদ্ধার হওয়া বিপুল খাস জমিতে তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক, কারাগার বা স্পোর্টস কমপ্লেক্সের মতো আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সবকিছু বিবেচনায় জঙ্গল সলিমপুর আজ একটি ক্ষতবিক্ষত জনপদের নাম। পাহাড় নিধন, ভূমিদস্যুতা এবং হাজার কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের বলি হয়েছে প্রকৃতি ও আইন।
সাম্প্রতিক প্রশাসনিক অভিযান স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও বড় প্রশ্ন থেকে যায়— যারা বছরের পর বছর প্রশাসনের চোখের সামনে এই সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়দাতাদের কি বিচারের মুখোমুখি করা হবে?
জঙ্গল সলিমপুরকে সত্যিকার অর্থে পুনরুদ্ধার করতে হলে শুধু দখলমুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; পাহাড় ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি দখলদারকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
এফআর