হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের আরোপিত অবরোধ মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। তবে ফ্রান্স স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের ১৬তম দিনেও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে।
শনিবার (১৫ মার্চ) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালীকে নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখতে কাজ করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য এই উদ্যোগে যুক্ত হবে। তবে তার এমন বক্তব্যের পরপরই ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে ১০টি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো প্রস্তুতি তারা নেয়নি।
ফ্রান্সের সোজাসাপ্টা ‘না’
ট্রাম্পের আহ্বানের পরপরই ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর খবর সত্য নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অবরোধ ভাঙতে বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে জোট গঠন করে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কথা বললেও ফ্রান্স তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফ্রান্স জানায়, তারা নতুন করে কোনো নৌযান মোতায়েন করছে না এবং তাদের বিমানবাহী রণতরী বর্তমানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের ১৬তম দিনেও গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও উত্তেজনা বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, না। বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই অবস্থান করছে। ফ্রান্সের অবস্থান অপরিবর্তিত— প্রতিরক্ষামূলক ও সুরক্ষামূলক।
ফ্রান্সের এই স্পষ্ট অবস্থান ট্রাম্পের কথিত ‘মিত্র জোট’ গঠনের দাবিকে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘কোনো আমেরিকান জাহাজ নয়’
একই পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতার ‘১০০ শতাংশ ধ্বংস’ করে দিয়েছে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি স্বীকার করেন, ইরান এখনও ড্রোন, মাইন বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে জলপথে হামলা চালাতে পারে। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র উপকূল বরাবর বোমাবর্ষণ করবে এবং ইরানি নৌকা বা জাহাজকে গুলি করে ধ্বংস করবে।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরি বলেন, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি সামরিকভাবে বন্ধ করা হয়নি, বরং এটি কেবল নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়েছে। তিনি ট্রাম্পের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে সমালোচনা করেন।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানান, যুক্তরাষ্ট্র প্রণালী দিয়ে জাহাজগুলোকে এসকর্ট করার জন্য প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, এই প্রণালী কেবল শত্রু ও তাদের মিত্রদের জাহাজের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সময়ে ইরানের সুপ্রিম লিডারের ঘনিষ্ঠ সংস্থা এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিল-এর সদস্য মহসেন রেজাই বলেন, কোনো আমেরিকান জাহাজের উপসাগরে প্রবেশের অধিকার নেই।
এদিকে, ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পর ইরান কিছু জাহাজকে বিশেষ ছাড় দিয়েছে। এলপিজি বহনকারী দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী ট্যাংকার এবং একটি তুর্কি মালিকানাধীন জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাতহালি জানিয়েছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-এর মধ্যে সরাসরি আলোচনার ফলেই এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে, তুর্কি মালিকানাধীন একটি জাহাজকেও একইভাবে প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আঙ্কারা তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে তাদের জাহাজ চলাচলের পথ খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। জানা গেছে, আরও ১৪টি তুর্কি জাহাজ এখনও অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।
ঝুঁকিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ
‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর মতে, হরমুজ প্রণালীতে এই অবরোধ বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রণালী এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) পরিবহনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। এলএনজি হলো নাইট্রোজেনভিত্তিক সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল, যা বিশ্বের প্রধান খাদ্যশস্য ও দানাশস্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। এসব শস্যই বিশ্বজুড়ে মানুষের মোট ক্যালোরি চাহিদার ৪০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, সামরিক শক্তি ব্যবহার করে দ্রুত এই প্রণালী খুলে দেওয়া সহজ নয়। কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হলে সেগুলো ইরানের সস্তা কিন্তু কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে, ভারত রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকটে পড়েছে এবং দেশটির প্রায় ৩৩৩ মিলিয়ন এলপিজি-নির্ভর পরিবারের চাহিদা মেটাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করে বলেছেন, মানবিক সহায়তাবাহী পণ্য যদি নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে না পারে, তাহলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত হয়েছে। লেবাননেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখোমুখি হচ্ছে।
লন্ডনের কিংস কলেজ-এর নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের জোট গঠনের আহ্বান আসলে হরমুজ প্রণালী সংকট মোকাবিলায় সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনার অভাব ঢাকার চেষ্টা।
তার মতে, শুরু থেকেই মনে হচ্ছে প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে কী করা হবে— সে বিষয়ে কোনো প্রস্তুত পরিকল্পনা ছিল না। বাজারকে শান্ত রাখতে এবং ইরান সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ছাড়াই পরিস্থিতি সমাধানের আশা থেকে এটি একটি মরিয়া পদক্ষেপ বলেই মনে হচ্ছে।
ক্রিগ আরও বলেন, প্রণালী দ্রুত খুলে দেওয়ার কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই। কারণ, শিপিং বিমা কোম্পানিগুলোকে ভয় পাইয়ে দিতে ইরানের মাঝে মাঝে হামলা চালালেই যথেষ্ট। তার মতে, কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানো মানে হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক জাহাজগুলোকে সস্তা কিন্তু কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার মুখে ঠেলে দেওয়া।
/ইউএমএইচ