একসময়ে আমরা গর্ব করতাম যে বাংলাদেশের মানুষ দেশকে গড়ে তুলতে নিজের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে এগিয়ে আসবে। কিন্তু আজ সেই গর্ব ধীরে ধীরে ছিটকে যাচ্ছে বিদেশের চাকরি, উচ্চশিক্ষা বা উন্নত জীবনের আকাক্সক্ষার চাপে। প্রতিদিনই শত শত তরুণ, দক্ষ পেশাজীবী উন্নত জীবনের সন্ধানে দেশের সীমানা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে- একে আমরা মেধা পাচার বলি। শুধু ব্যক্তিগত জীবনের উন্নয়ন নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হাজার হাজার কোটি টাকার শিক্ষা ও কর্মশক্তি বিনিয়োগ হারিয়ে দিচ্ছে এবং দেশীয় উদ্ভাবন ও উন্নয়নের পথ কমিয়ে দিচ্ছে।
মেধা পাচার বলতে বোঝায় দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষিত, দক্ষ ও প্রতিভাবান মানুষগুলো যখন গবেষণা, চাকরি বা উন্নত জীবনের সন্ধানে দেশ ছেড়ে চলে যায়- এতে দেশে মানবসম্পদ হ্রাস পায় এবং সেই সংস্থানগুলো দেশের উন্নয়নের বদলে অন্য দেশে কাজে লাগতে থাকে। বাংলাদেশে এই প্রবণতা অতীতে বহুবার আলোচিত হয়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে। বিশ্বব্যাংক অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৫ শতাংশ বিদেশে বসবাস করছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশ হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবী যেমনÑ ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, শিক্ষক ও আইটি বিশেষজ্ঞ।
এটি শুধুই একটি সংখ্যা নয়- এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও কিছু বাস্তব উপাত্ত যা এই সমস্যার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। যেমনÑ ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ২ লাখের বেশি দক্ষ কর্মী বিদেশে স্থানান্তরিত হয়েছে, যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। আবারটিবিএ নিউজ জানায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার ১৫৮ জন পেশাজীবী (যেমন ডাক্তার, নার্স, ইঞ্জিনিয়ার, আইটি বিশেষজ্ঞ) বিদেশে গেছেন। এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
এসব পরিসংখ্যানই বোঝায় যে শুধু শ্রমিকরা নয়, উচ্চশিক্ষিত এবং দক্ষ পেশাজীবীরাও দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী বাংলাদেশ ছেড়ে উন্নত জীবনের সন্ধানে বিদেশ গেছে।
মেধা পাচারের পেছনে মূল কারণগুলো বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই আছে উন্নত জীবনযাত্রা ও সুযোগের আকর্ষণ। কোনো তরুণ বা পেশাজীবী যখন দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ, উচ্চ বেতন, উন্নত গবেষণা পরিবেশ বা সামাজিক নিরাপত্তা পায় না, তখন সে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশের দিকে তাকায়।
দ্বিতীয় কারণ হলো দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের অভাব। যেখানে উন্নত দেশগুলো গবেষণা ও প্রযুক্তিতে প্রচুর টাকা ও সুযোগ দেয়, দেশে সেই পরিমাণ বিনিয়োগ বা সুযোগ নেই। ইউনেস্কো এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার বলেছে যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ থাকলে তরুণ গবেষকরা দেশে থেকেই কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
মেধা পাচারের প্রভাব দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে গভীর। প্রথম প্রভাব হলো মানবসম্পদ ক্ষয়- যেখানে গবেষণা, উদ্ভাবন ও নতুন প্রযুক্তির বিকাশে দক্ষ মানুষের অভাব দেখা দেয়। এটি শুধু শিক্ষা বা চিকিৎসা নয়; আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি, পরিবেশ বিজ্ঞান সব ক্ষেত্রেই দেশের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় প্রভাব হলো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের অপচয়। প্রতি বছর প্রচুর টাকা খরচ করে সরকার, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করে, কিন্তু সেই বিনিয়োগের ফল বৃহত্তরভাবে দেশে ফিরে আসে না। বিশ্বব্যাংক পূর্বেও উল্লেখ করেছে, দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে দেশের সম্ভাব্য জিডিপি বৃদ্ধির হার প্রায় ০.৫ শতাংশ কমে যেতে পারে, এটা অর্থনীতির জন্য বড় একটি ক্ষতি। এ অবস্থার সমাধান সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। প্রথমত দেশের গবেষণা ও শিক্ষা খাতে বৃহৎ বিনিয়োগ ও পরিবেশ উন্নয়ন করা দরকার। উন্নত গবেষণা ল্যাব, স্কলারশিপ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময় সুযোগ দিলে উন্নত পেশাজীবীরা দেশে থেকেই কাজ করতে অনুপ্রাণিত হবে।
একটি সফল উদাহরণ হিসেবে অনেক উন্নত দেশ এখন ব্রেন সার্কুলেশন নীতি গ্রহণ করেছে- এতে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের দেশে ফেরত আসার সুযোগ ও উদ্দীপনা প্রদান করে, যেমন পরামর্শক, প্রকল্প প্রধান বা গবেষণা ইনভেস্টমেন্টের সুযোগ দিয়ে। বাংলাদেশও এই রকম নীতির পরিকল্পনা করলে মেধাবীদের ফেরানো যেতে পারে। যদি আমরা এখনই সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি, তা হলে মেধা পাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং মেধাবী তরুণদের দেশে ধরে রেখে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/কেএইচও