অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল দেশের সাত জেলায় যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে তা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি, খাদ্যব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং মানুষের জীবিকার ওপর বন্যা বহুমাত্রিক আঘাত হেনেছে। সরকারি হিসাবে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ১২ লাখ ১৬ হাজার ৮০৫ জন। প্লাবিত হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর ফসলি জমি। যা খাদ্য উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা থেকে ধারণা করা যায়, এবার দুর্যোগের অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কৃষি খাতে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ৫ লাখ ২৭ হাজার কৃষক। আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এ কারণে সামনের দিনগুলো কৃষকদের ভুগতে হবে, ভোক্তা সাধারণও দুর্ভোগে পড়বেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি পুকুর, দীঘি ও ঘের। পাঁচ জেলায় ৮৪৬টি সড়ক এবং ২৩৫টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থাও বড় চাপের মুখে পড়েছে। সরকার ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রণয়ন, কৃষি প্রণোদনা, ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে। এসবই প্রয়োজনীয়। জরুরি হচ্ছে উদ্যোগগুলো ঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করা।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্য শুধু অস্বাভাবিক বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলই দায়ী নয়। সংকট তীব্র হয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে। পাহাড়ে ভূমি ব্যবহার হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। দখল-দূষণ-ভরাটে নদী ও খালের নাব্যতা কমেছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ। নিষ্কাশনব্যবস্থা দুর্বল। এসব কারণে বন্যা ও জলাবদ্ধতার সময় দীর্ঘ হচ্ছে।
দেশের কৃষি ও মৎস্য খাতের বড় অংশ এখনও এমন উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহজেই বিপর্যস্ত হয়। বন্যাপরবর্তী সময়ে সরকার তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বীজ, সার, কৃষি প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন জরুরি হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করা, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা।
রাষ্ট্রের সহায়তা বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগের কাক্সিক্ষত সুফল মেলে না। অতীত অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, রাষ্ট্র হয়তো একবারে সবার সব ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না। তবে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর এ জন্যই মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং স্বাধীনভাবে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নের বিকল্প নেই।
প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে দ্রুত বীজ ও সার বিতরণ করতে হবে। একটি দিনও যেন কোনো কারণে নষ্ট না হয়। কৃষিঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দিতে হবে। ক্ষুদ্র মৎস্যচাষি ও খামারিদের জন্য সহজশর্তে পুনর্বাসন তহবিল গঠন করার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হবে বলে আমরা আশা করতে চাই। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু শুধু দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। ভবিষ্যতের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল বিবেচনায় রেখে দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই। পাহাড়ে সুষ্ঠু ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। নদ-নদীসহ সব জলাশয় দখল-দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা দরকার। নগর ব্যবস্থাপনায় নিষ্কাশনব্যবস্থাকে করতে হবে শক্তিশালী।
বন্যা আমাদের কেবল দুর্যোগ মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে না; এটি রাষ্ট্রের পরিকল্পনা, অবকাঠামো, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিনীতির কার্যকারিতাকেও পরীক্ষার মুখে ফেলে। আগামীতে যেন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক হতে হবে। এবারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ।
সময়ের আলো/আআ