দাজ্জালের আগমন হবে পৃথিবীর অন্যতম আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। দাজ্জাল এসে পুরো পৃথিবী উলট-পালট করে দেবে। খুব অল্প সময়ে সে পুরো পৃথিবীর এক প্রান্ত অপর প্রান্ত পর্যন্ত পরিভ্রমণ করবে এবং জনপদে জনপদে মানুষকে তার বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করবে। হাদিসে এসেছে, নবীজিকে দাজ্জালের চলার গতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘দ্রুতগামী বাতাস বৃষ্টিকে যেভাবে চালিয়ে নেয় দাজ্জালের চলার গতিও সে রকম হবে’ (মুসলিম, হাদিস : ২৯৩৭)।
আরেক হাদিসে নবীজি বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে সংবাদ দেবো, যা হজরত নুহ থেকে সব নবীই তার উম্মতকে বলেছেন? শোনো, দাজ্জাল হবে কানা ও অন্ধ। তার সঙ্গে জান্নাত ও জাহান্নাম নামের দুটো ভেলকি থাকবে। যাকে সে জান্নাত বলবে, সেটা মূলত জাহান্নাম। আর যাকে সে জাহান্নাম বলবে, সেটা মূলত জান্নাত’ (মুসলিম, হাদিস : ২৯৩৬)।
অপর হাদিসে এসেছে, ‘দাজ্জালের সাথে যা থাকবে তা আমি অবগত আছি। তার সাথে দুটি নদী প্রবাহিত থাকবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একটিতে সুন্দর পরিষ্কার পানি দেখা যাবে। অন্যটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাবে। যার সাথে দাজ্জালের সাক্ষাৎ হবে সে যেন দাজ্জালের আগুনে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে পান করে। কারণ তা সুমিষ্ট পানি। তার চোখের ওপরে মোটা আবরণ থাকবে। কপালে কাফের লেখা থাকবে। মূর্খ ও শিক্ষিত সকল ঈমানদার লোকই তা পড়তে পারবে’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫৯৮)।
আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আসমা বিনতে ইয়াজিদ রা. বলেন, একদিন আমরা নবীজির সাথে তার ঘরে অবস্থান করছিলাম। তখন তিনি দাজ্জাল বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বললেন, দাজ্জালের আবির্ভাবের পূর্বে তিনটি বছর এমন হবে যে, প্রথম বছর আকাশ তার এক তৃতীয়াংশ বৃষ্টি বন্ধ করে দেবে। ভূমি তার এক তৃতীয়াংশ ফসল উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। দ্বিতীয় বৎসর আকাশ তার দুই তৃতীয়াংশ বৃষ্টি বন্ধ করে দেবে। ভূমি তার দুই তৃতীয়াংশ ফসল উৎপাদন বন্ধ করে দেবে। তৃতীয় বৎসর আকাশ তার পরিপূর্ণ বৃষ্টি বন্ধ করে দেবে। পাশাপাশি ভূমিও তার ফসল উৎপাদন পরিরূপে বন্ধ করে দেবে। ফলে সুস্থ ও অসুস্থ সকল গরু ছাগল ও প্রাণীর প্রাণহানি ঘটবে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৭৫৬৮)।
দাজ্জাল মক্কা-মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না
দাজ্জালের জন্যে মক্কা ও মদিনায় প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। মক্কা-মদিনা ছাড়া পৃথিবীর সব ভূখণ্ডেই সে প্রবেশ করবে। ফাতেমা বিনতে কায়েস রা. থেকে বর্ণিত, ‘দাজ্জাল বললো, আমি হলাম দাজ্জাল। অচিরেই আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি বের হয়ে চল্লিশ দিনের ভিতরে পৃথিবীর সব দেশ ভ্রমণ করবো। তবে মক্কা-মদিনায় প্রবেশ করা আমার জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। যখনই আমি মক্কা বা মদিনায় প্রবেশ করতে চাইবো তখনই কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে ফেরেশতারা আমাকে তাড়া করবে। মক্কা-মদিনার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতারা পাহারা দেবে’ (মুসলিম)। আবু বাকরাহ রা. বলেন, রাসুল সা. বলেছেন, ‘মদিনার ভেতর দাজ্জাল ভয়েও প্রবেশ করবে না। সে সময় মদিনার সাতটি দরজা থাকবে। প্রতিটি দরজায় দুইজন করে ফেরেশতা পাহারায় নিয়োজিত থাকবেন’ (বুখারি, হাদিস : ৭১২৫)।
পৃথিবীতে দাজ্জালের অবস্থান ও বিচরণ
সাহাবিগণ নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, দাজ্জাল পৃথিবীতে কত দিন অবস্থান করবে? উত্তরে নবীজি বললেন, সে চল্লিশ দিন অবস্থান করবে। প্রথম দিনটি হবে এক বছরের মতো দীর্ঘ। দ্বিতীয় দিনটি হবে এক মাসের মতো দীর্ঘ। তৃতীয় দিনটি হবে এক সপ্তাহের মতো দীর্ঘ। আর বাকী দিনগুলো দুনিয়ার স্বাভাবিক দিনের মতোই হবে। আমরা বললাম, যে দিনটি এক বছরের মতো দীর্ঘ হবে সে দিন কি এক দিনের নামাজই যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না; বরং তোমরা অনুমান করে সময় নির্ধারণ করে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে’ (মুসলিম, হাদিস : ২৯৪০)।
দাজ্জালের শেষ পরিণতি
মক্কা-মদিনা ছাড়া পৃথিবীর সব স্থানে দেশেই সে ভ্রমণ করবে। তার অনুসারীর সংখ্যা হবে প্রচুর। সমগ্র দুনিয়ায় তার ফেতনা ছড়িয়ে পড়বে। সামান্যসংখ্যক মুমিনই তার ফেতনা থেকে আত্মরক্ষা করতে পারবে। ঠিক সে সময় দামেস্ক শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এক মসজিদের সাদা মিনারের উপর হজরত ঈসা আ. আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। মুসলমানগণ তার পাশে একত্র হবে। তাদেরকে সাথে নিয়ে তিনি দাজ্জালের দিকে রওনা দেবেন। দাজ্জাল সে সময় বায়তুল মাকদিসের দিকে অগ্রসর হতে থাকবে। অতঃপর ঈসা আ. ফিলিস্তিনের লুদ্দ শহরের গেইটে দাজ্জালকে পাকড়াও করবেন। ঈসা আ.-কে দেখে সে পানিতে লবণ গলার মতো গলতে শুরু করবে। ঈসা আ. তাকে লক্ষ করে বলবেন, তোমাকে আমি একটি আঘাত করবো যা থেকে তুমি কোনোভাবেই বাঁচতে পারবে না। ঈসা আ. তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করবেন এবং মুসলিম বাহিনীতে ফিরে এসে তার নেজায় লেগে থাকা দাজ্জালের রক্ত দেখাবেন’ (মুসলিম, হাদিস : ২৯৩৭)।
হজরত নাওয়াস ইবনে সামআন রা. বলেন, রাসুল সা. দাজ্জালের আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন, ‘দাজ্জাল যখন মুসলমানদের ঈমান ধ্বংসের কাজে লিপ্ত থাকবে আল্লাহ তায়ালা তখন ঈসা ইবনে মারিয়াম আ.-কে পাঠাবেন। জাফরানের রঙ্গে রঙ্গিত এক জোড়া পোশাক পরিহিত হয়ে এবং দুজন ফেরেশতার পাখার ওপর হাত রেখে দামেস্ক শহরের পূর্বে অবস্থিত সাদা মিনারের উপর তিনি অবতরণ করবেন। তিনি যখন মাথা নিচু করবেন তখন সদ্য গোসলখানা থেকে বেরিয়ে আসা ব্যক্তির মাথা থেকে যেভাবে পানি ঝরতে থাকে সেভাবে তার মাথা থেকে পানির ফোঁটা ঝরতে থাকবে এবং যখন মাথা উঁচু করবেন তখন অনুরূপভাবে তার মাথা থেকে মণি-মুক্তার মতো চকচকে পানির ফোঁটা ঝরতে থাকবে। কাফেরের শরীরে তার নিশ্বাস পড়ার সাথে সাথেই কাফের মৃত্যুবরণ করবে। চোখের দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত গিয়ে তার নিশ্বাস শেষ হবে। তিনি দাজ্জালকে খুঁজবেন এবং ফিলিস্তিনের লুদ শহরের ফটকে তাকে ধরে ফেলবেন। অতঃপর তাকে সেখানে হত্যা করবেন। তারপর তার নিকট এমন কিছু লোক আসবেন যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা দাজ্জালের ফেতনা থেকে হেফাজত করেছেন। তিনি তাদের চেহারায় হাত বুলাবেন এবং জান্নাতে তাদের উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে সংবাদ দেবেন’ (মুসলিম, হাদিস : ২৯৩৭)।
হজরত জাবের রা. বলেন, রাসুল সা. বলেছেন, ‘দ্বীন দুর্বল হয়ে পড়ার পর দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। তারপর ঈসা আ. আসমান থেকে অবতরণ করবেন। সুবহে সাদিকের পূর্ব মুহূর্তে সেহরির সময় তিনি উচ্চস্বরে বলবেন, হে মুসলমানেরা! এই মিথ্যাবাদির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে তোমরা বিরত রয়েছো কেনো? লোকেরা বলাবলি করবে, জিন-ভুত নাকি! এরপর তারা অগ্রসর হয়ে ঈসা আ.-কে দেখতে পাবে। ফজরের নামাজের ইকামত হলে ইমাম মাহদি বলবেন, হে রুহুল্লাহ! ইমামতির জন্য সামনে অগ্রসর হোন। ঈসা আ. বলবেন, তোমাদের ইমামই তোমাদের ইমামতি করবেন। নামাজের পর লোকেরা ঈসা আ.-এর নেতৃত্বে দাজ্জালের সঙ্গে মোকাবিলা করতে বের হবে। দাজ্জাল ঈসা আ.-কে দেখে ভয়ে লবণের মতো গলে যাবে।’ (মুসলিম : ১/৮৭)।
আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘দাজ্জাল ঈসা আ.-এর আগমন সম্পর্কে জানতে পেরে বাইতুল মাকদিসের দিকে চলে যাবে। সেখানে গিয়ে একদল মুসলমানকে অবরোধ করে রাখবে। ঈসা আ. সেখানে গিয়ে দরজা খুলতে বলবেন। দরজা খুলে দেওয়া হলে তিনি পিছনে দাজ্জালকে দেখতে পাবেন। তার সাথে থাকবে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত সত্তর হাজার ইহুদি। দাজ্জাল ঈসা আ.-কে দেখেই পানিতে লবণ গলার মতো গলতে থাকবে এবং পালাতে চেষ্টা করবে। ঈসা আ. তাকে লক্ষ করে বলবেন, তোমাকে আমি একটি আঘাত করব যা থেকে তুমি কোনোভাবেই বাঁচতে পারবে না। ঈসা আ. লুদ্দ শহরের পূর্ব গেইটে তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করবেন। (সহিহুল জামেউস সগির : ১৩৮৩৩)।
লুদ্দ বর্তমান ইসরায়েল অধিকৃত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের একটি ছোট শহর, যা তেলআবিব থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। ইসরায়েলের প্রধানতম বিমানবন্দর বেন গুরিয়ান বিমানবন্দর এ শহরের কাছেই অবস্থিত।
সময়ের আলো/জেডআই