মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা শেষে আসে আনন্দের ঈদ। ঈদের আনন্দ যেন শুধু ধনীর ঘরে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং গরিবের ঘরেও ঈদের হাসি ছড়ায়, সে জন্য রয়েছে ফিতরার বিধান। ফিতরা শুধু দরিদ্র মানুষের সহায়তার মাধ্যমই নয়, বরং রোজাদারের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করারও একটি উপায়।
মহানবী (সা.) রমজান শেষে ঈদের আগে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে সমাজের অসহায় মানুষও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। তাই সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্ব।
যেসব মুসলিম নর-নারীর মালিকানায় মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্য সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তাদের ওপর সদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার জন্য সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া, বালেগ হওয়া বা মুকিম হওয়া শর্ত নয়। অতএব অবুঝ-নাবালেগ, মুসাফির এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিও যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তা হলে তাদের ওপরও সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে।
হাদিসে নবীজি (সা.) ছোট-বড় সবার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। নাবালেগ ও মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির সম্পদ থাকলে তার অভিভাবক সেই সম্পদ থেকে ফিতরা আদায় করবেন। নবীজি (সা.) ছোট-বড় সবার ওপর সদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন। (রদ্দুল মুহতার ২/৩৫৯)
হাদিসে মোট পাঁচ ধরনের খাদ্য দ্বারা সদাকাতুল ফিতর আদায়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেগুলো হলো ১. যব। ২. খেজুর। ৩. পনির। ৪. কিশমিশ। ৫. গম।
এই পাঁচটির মধ্যে যব, খেজুর, পনির ও কিশমিশ দিয়ে ফিতরা দিতে চাইলে মাথাপিছু এক সা পরিমাণ দিতে হবে, যা কেজির হিসাবে প্রায় ৩ কেজি ২৭০ গ্রাম। আর গম দিয়ে ফিতরা আদায় করলে আধা সা দিতে হবে, যা কেজির হিসাবে প্রায় ১ কেজি ৬৩৫ গ্রাম।
উল্লেখ্য, হাদিসে এই পাঁচটি দ্রব্যের যেকোনো একটি দিয়ে ফিতরা আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে মুসলমানরা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী তা আদায় করতে পারেন। তাই যার সামর্থ্য আছে তিনি উন্নতমানের আজওয়া খেজুর হিসাবেও ফিতরা আদায় করতে পারেন। কারও সাধ্য হলে পনির হিসাবেও দিতে পারেন। এর চেয়ে কম আয়ের মানুষ খেজুর বা কিশমিশের মূল্য হিসাবেও দিতে পারেন। আর যাদের জন্য এগুলোর হিসাবে দেওয়া কঠিন, তারা গমের হিসাবেই ফিতরা আদায় করবেন।
হাদিসে বর্ণিত খাদ্যদ্রব্য দিয়ে যেমন ফিতরা দেওয়া যায়, তেমনি সেগুলোর মূল্য দিয়েও ফিতরা আদায় করা জায়েজ।
হজরত কুররা (রহ.) বলেন, ‘আমাদের কাছে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর ফরমান পৌঁছেছে যে, সাদাকাতুল ফিতর হলো প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির পক্ষ থেকে অর্ধ সা গম অথবা তার মূল্য হিসাবে অর্ধ দিরহাম প্রদান করা’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ১০৪৭০)।
বিশিষ্ট তাবেয়ি আবু ইসহাক (রহ.) বলেন, ‘আমি সাহাবি ও তাবেয়িগণকে খাদ্যের মূল্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে দেখেছি’ (উমদাতুল কারি : ৯/৪)।
একজন দরিদ্র মানুষকে পূর্ণ একটি ফিতরা দেওয়া উত্তম। তবে একটি ফিতরা কয়েকজন গরিবের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া জায়েজ। একইভাবে একাধিক ব্যক্তির ফিতরা এক ব্যক্তিকেও দেওয়া বৈধ। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/২০৮)
সাদাকাতুল ফিতর ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও মানবিক ইবাদত। এটি দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটায় এবং ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি রোজাদারের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে তার ইবাদতকে পরিপূর্ণ করে। তাই সামর্থ্যবান মুসলমানদের উচিত যথাসময়ে এবং যথাযথ নিয়মে ফিতরা আদায় করা। এতে যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, তেমনি সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা পায়।