মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অবস্থানগত দূরত্ব তৈরি করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো। হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনী মোতায়েনের আহ্বান সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) স্পষ্ট করে দিয়েছে- তারা এই সংকটে সামরিকভাবে জড়াতে চায় না।
ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে জোটটির পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাস জানান, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো আগ্রহ নেই। তার ভাষায়, ইউরোপ এমন কোনো সংঘাতে জড়াতে চায় না, যা দীর্ঘস্থায়ী ও অনিশ্চিত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ইউরোপের মূল লক্ষ্য এখন সমুদ্রপথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা। যদিও লোহিত সাগরে পরিচালিত ‘অপারেশন অ্যাসপিডেস’-এর মতো মিশন রয়েছে, তবে সেটিকে হরমুজ প্রণালিতে সম্প্রসারণের বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নেই।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানান, বিদ্যমান নৌ মিশনগুলো মূলত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা ও জলদস্যু দমনের জন্য পরিচালিত হয়। এগুলোকে হরমুজের মতো উচ্চ-সংকটপূর্ণ এলাকায় সম্প্রসারণ করা বাস্তবসম্মত নয় বলেও মত দেন তিনি।
একই অবস্থান নিয়েছে জার্মানি। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস জানিয়েছেন, জার্মানি উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক বাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে না। বরং দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বার্লিন।
আরও পড়ুন
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্তোরিয়ুসও সতর্ক করে বলেন, ন্যাটোর বাইরে কোনো সামরিক মোতায়েনের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া ও সংসদের অনুমোদন জরুরি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘টি আমাদের যুদ্ধ নয়’ -যা ইউরোপের অবস্থানকে আরও পরিষ্কার করে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি জানান, ব্রিটেন বৃহত্তর কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না এবং যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আইনি বৈধতা থাকা আবশ্যক।
এদিকে পোল্যান্ড ও বেলজিয়ামও কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সমালোচনা করে বলেন, একদিকে ন্যাটো থেকে দূরত্বের বার্তা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ইউরোপকে সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে- যা পরস্পরবিরোধী।
বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ভেভারও পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল স্বাভাবিক রাখতে অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তিনি সেসব দেশের নাম প্রকাশ করেননি।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হতো। ফলে পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
এএডি/