পবিত্র রমজান মাসের শেষেই আসে মুসলমানদের আনন্দের ঈদ-ঈদুল ফিতর। আর ঈদুল ফিতরের দিনের অন্যতম আমল হলো ফিতরা আদায় করা। ইসলামে ফিতরার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি জাকাতেরই একটি প্রকার। রাসুল (সা.) হাদিস ও সুন্নাহে তা আদায়ের তাকিদ করেছেন এবং এর নিয়ম-নীতি শিক্ষা দিয়েছেন। এ কারণেই রাসুলের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ ইসলামের পাঁচ রোকন ও দ্বীনের অন্যান্য মৌলিক আমল ও ইবাদতের মতো সদকাতুল ফিতরও নিয়মিত আদায় করে আসছে। আমাদের এ অঞ্চলে তা ‘ফিতরা’ নামে পরিচিত।
ঈদের আনন্দে যেন মুসলিম জাতির প্রতিটি সদস্য শরিক হতে পাওে, এ জন্য ফিতরা ওয়াজিব করা হয়েছে। এতে রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতিও পূরণ হয়ে যায়। একটি হাদিসে এসেছে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) সদকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন অর্থহীন, অশালীন কথা ও কাজে রোজার যে ক্ষতি হয় তা পূরণের জন্য এবং নিঃস্ব লোকের আহার জোগানোর জন্য (আবু দাউদ : ১৬১১)।
অন্য হাদিসে এসেছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত সদকায়ে ফিতর আদায় করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার রোজা জমিন ও আসমানের মাঝখানে ঝুলন্ত থাকে।’ (কানযুল উম্মাল : ২৪১২৯)
ফিতরা কার ওপর ওয়াজিব?
ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় কারও কাছে সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত সম্পদ বিদ্যমান থাকলে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। যার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমনি নিজের অধীনস্থদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। তবে সদকাতুল ফিতর ও জাকাতের মধ্যে সামান্য কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদ বৃদ্ধি পায় এমন সম্পদ হতে হবে। কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে এমনটি নয়। জাকাতের সম্পদ পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হতে হয়, কিন্তু সদকাতুল ফিতর তাৎক্ষণিক ওয়াজিব হয় (ফাতহুল কাদির : ২/২৮১)।
এমনকি ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় কোনো নবজাতক দুনিয়ায় এলে কিংবা কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে, তার পক্ষ থেকেও সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি : ১/১৯২)
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে
সন্তান প্রাপ্তবয়স হওয়ার পর পিতার পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব নয়। তবে পিতা যদি সন্তানের পক্ষ হয়ে আদায় করে দেন, তা হলে তা আদায় হয়ে যাবে। তেমনি স্বামী স্ত্রীর সদকাতুল ফিতর আদায় করেন, তা হলেও তা হয়ে যাবে (দুররুল মুখতার : ৩/২৮৫)।
তাই আমাদের সবার কর্তব্য হলো, খুশিমনে সদকাতুল ফিতর আদায় করা, যাতে করে পরস্পরে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা যায়, অসহায়, গরিব ও ঋণগ্রস্ত মানুষের সহযোগিতা হয় এবং নিজের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ হয়। সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ইবাদত আদায়ের সৌভাগ্য অর্জিত হয়।
ফিতরা আদায়ে কী দেবেন?
রাসুল (সা.)-এর যুগে মোট চারটি পণ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো, যেমন- খেজুর, কিশমিশ, জব ও পনির। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমাদের সময় ঈদের দিন এক সা খাদ্য দ্বারা সদকা আদায় করতাম। আর তখন আমাদের খাদ্য ছিল জব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর (বোখারি : ১৪৩৯)।
রাসুল (সা.)-এর যুগে গমের ভালো ফলন ছিল না বিধায় আলোচিত চারটি পণ্য দ্বারাই ফিতরা আদায় করা হতো। এরপর হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর যুগে গমের ফলন বেড়ে যাওয়ায় গমকে আলোচিত চারটি পণ্যের সঙ্গে সংযোজন করা হয়। আর তখন গমের দাম ছিল বাকি চারটি পণ্যের তুলনায় বেশি। আর মূলত এই দাম বেশি থাকার কারণেই হজরত মুয়াবিয়া গমকে ফিতরার পণ্যের তালিকাভুক্ত করেছিলেন।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) এক সা খেজুর বা এক সা জব দিয়ে ফিতরা আদায় করার আদেশ দিয়েছেন। পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরামগণ দুই মুদ (আধা সা) গমকে এগুলোর সমতুল্য মনে করেন এবং আদায় করেন (বুখারি : ১৪৩৬)।
এ থেকে বোঝা যায়, গম দ্বারা আদায় করলে আধা সা বা ১ কেজি ৬২৮ গ্রাম দিলেই ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। আর বাকি চারটি পণ্য অর্থাৎ খেজুর, জব, পনির ও কিশমিশ দ্বারা আদায় করার ক্ষেত্রে জনপ্রতি এক সা বা ৩ কেজি ২৫৬ গ্রাম দিতে হবে। হাদিসে শুধু খাদ্যবস্তুর নাম এসেছে, এ জন্য অনেক আলেম বলেছেন, যে বস্তুর নাম হাদিসে আছে তা দিয়েই ফিতরা দিতে হবে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, এসবের মূল্য দিলেও ফিতরা আদায় হবে।
কারণ ‘আনফাউ লিল ফুকারা’, অর্থাৎ যা দ্বারা গরিবের বেশি উপকার হয় তা দেবে। কাঁচা খাদ্য খাওয়া ছাড়া অন্য কাজে লাগে না। বেশি হলে নষ্ট হয়। বিক্রিও সম্ভব হয় না। অতএব, গরিবদের জন্য নগদ টাকা পেলে বেশি উপকারী। যেখানে ইচ্ছা খরচ করতে পারে।
সময়ের আলো/কেএইচও