মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ইছামতী নদীর নাব্যতা হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শুকিয়ে মরা খাল হয়ে পড়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৬০ বছর আগে নদীটি খনন করা হয়েছিল বর্তমানে নাব্যতা সংকট চরমে। বর্ষা মৌসুম যেতে না যেতেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে ইছামতী। বর্তমানে নদীজুড়েই বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন তীরবর্তী
কৃষকরা। নদীতে পানিশূন্যতায় এ অঞ্চলের বিল-বাঁওড়ে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। প্রায় ৩৫ বছর আগে এই নদীতে লঞ্চ চলত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পথে। তবে দীর্ঘ সময়েও নদী খনন না করার কারণে এখন নদী খরস্রোতা নয়, বরং কচুরিপানা ও পলিময় অবস্থায় ভরপুর। বাসাইল, তালতলা, সিরাজদিখান সন্তোষপাড়া, ভূইরাসহ অনেক জায়গায় নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সময়ের প্রমত্তা ইছামতী বর্তমানে যৌবন হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। মূলত বর্ষা মৌসুমে দুই-তিন মাস নদীতে পানি দেখা যায়। বর্ষা শেষ হতে না হতেই আবার নদীটি তার আপন সত্তা হারিয়ে ফেলে। দেখা দেয় চরম আকারে নাব্য সংকট।
এবার ইছামতী নদী তীরবর্তী কৃষকরা ৮-১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলতি মৌসুমে বোরো ধান চাষ করছেন। অথচ এই নদীতে নব্বই দশকের মাঝামাঝিতেও চৈত্র ও বৈশাখ মাসে থাকত অথৈ পানি। ছিল দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের মাছ। এ ছাড়া উপজেলার সর্ববৃহৎ তালতলা, সিরাজদিখান, নওপাড়া হাটে বিভিন্ন জেলা থেকে নৌপথে মালপত্র আনা-নেওয়া হতো এই নদী পথেই। নদীর নাব্য সংকটে এখন আর ব্যবসায়ীরা নৌপথে মালপত্র আনা-নেওয়া করতে পারেন না।
স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ ধরাও বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষকরাও পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পাচ্ছেন না। নদীর অনেক অংশ দখল হয়েছে এবং নৌপথে চলাচল প্রায় বন্ধ। ফলে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
রাজদিয়া টেংগুরিয়াপাড় জেলেপাড়া গ্রামের জেলে মৃত শ্রীচরণ দাসের ছেলে নিরঞ্জন দাস বলেন, ৩৫ বছর আগে আমরা লঞ্চে ঢাকা যাতায়াত করতাম। এই নদী থেকে মাছ ধরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে বিক্রি করতাম। এখন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ ধরাও সম্ভব নয়। আমাদের জীবিকা প্রায় থমকে গেছে। দ্রুত নদীটি খনন প্রয়োজন।
লতব্দী গয়াতলা গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান দেওয়ান বলেন, ইছামতী নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করায় বিল-বাঁওড়ে পানি ঢুকতে পারছে না। প্রতি বছরই বর্ষার পানি চলে যেতে না যেতেই নদীতে নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। এতে করে কৃষিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের পানি কমে গেছে, ফসল কম হচ্ছে। নদী খনন না হলে আমাদের জীবন অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
ইছামতী নদীর নাব্যতা সংকট নিয়ে সিরাজদিখান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ শুভ্র বলেন, নাব্য সংকট এখন সারা দেশেই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এ উপজেলার গ্রামীণ জনপদ উন্নয়নে নদীর সঙ্গে সংযোগ অনেক খালও বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে যদি ধারাবাহিক নাব্য সংকট দেখা যায়, তা হলে কৃষির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ইছামতীর নাব্য সংকট রোধে কাজ করা প্রয়োজন।
সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী র্কমকর্তা (ইউএনও) রুম্পা ঘোষ বলেন, ইছামতী নদীর এই অবস্থা চরম উদ্বেগজনক। দ্রুত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নদী পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এটি শুধু পরিবহন সচল করবে না, কৃষি ও জলজ জীববৈচিত্র্যও ফিরিয়ে আনবে।
স্থানীয়দের পক্ষ থেকে দ্রুত খনন কার্যক্রম শুরু করার আহ্বান জানানো হয়। নদী পুনরুজ্জীবিত হলে মাছ আহরণ, সেচ ও নৌপরিবহন স্বাভাবিক হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাও উন্নত হবে।
সময়ের আলো/আআ