পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘিরে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন অসংখ্য মানুষ। ঈদের সকালে ঘরে ঘরে নতুন পোশাক, অতিথি আপ্যায়ন, কোলাহল আর হাসির উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠবে বাড়ির আঙিনা। কিন্তু এই উৎসবের দিনটিই গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার একটি বৃদ্ধাশ্রমে হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গতার আরেক নাম। সেখানে ঈদ মানে স্মৃতির ভেতর ডুবে থাকা আর চুপচাপ কেটে যাওয়া কয়েকটি দিন।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ছোট সোহাগি গ্রামে অবস্থিত মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রম। ঈদের দিন এখানকার উঠানে বসে আমিরুল ইসলাম পুরোনো দিনের কথা স্মরণ করছিলেন। তিনি বলেন, ঈদ এলেই মনে পড়ে যায় আগের দিনের কথা। বাড়িতে কত আয়োজন থাকত, কত মানুষ আসত। এখন সবই শুধু স্মৃতি।
তিনি জানান, ঈদ এলেই এখানকার অনেক বাসিন্দা স্মৃতিকাতর বা নস্টালজিক হয়ে পড়েন। কেউ পুরোনো দিনের সুখস্মৃতিতে ডুবে থাকেন, আবার কারও চোখ ভিজে ওঠে আপনজনের অভাবে।
গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে এই বৃদ্ধাশ্রমটি ২০১৭ সালে স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে ওঠে। শুরু থেকেই মানুষের অনুদানে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এখানে ৩৯ জন আশ্রিত রয়েছেন- এর মধ্যে ২৪ জন নারী ও ১৫ জন পুরুষ।
এদের অনেককেই বিভিন্ন সময় রাস্তা থেকে উদ্ধার করে এখানে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। কেউ হারিয়ে গিয়েছিলেন, কেউ বা পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছিলেন অপ্রয়োজনীয়। অথচ তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় কারও বাবা-মা ছিলেন, পরিবার গড়ে তুলেছিলেন নিজের শ্রম আর ত্যাগে।
ঈদের দিন বৃদ্ধাশ্রমের ঘরের ভেতরে কিংবা উঠানে বসে অনেকেই নীরবে চোখ মুছেন। বাইরে যখন আনন্দের উৎসব, তখন তাদের কাছে ঈদ যেন বিচ্ছিন্নতার প্রতীক।
ঈদের কয়েকদিন আগে মঙ্গলবার কথা হয় বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা মজিরন বেওয়ার সঙ্গে। স্মৃতির ভেতর ডুবে গিয়ে তিনি বলেন, আমার স্বামী, দুই ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল সংসার। ঈদের সময় বাড়িতে কত আয়োজন হতো। অতিথি আসত, আমরা আত্মীয়দের বাড়ি যেতাম। কথা বলতে বলতে থেমে যান তিনি। ভারী হয়ে আসে কণ্ঠ।
দশ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তার জীবন। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় আর ছেলেদের সংসারে তিনি হয়ে ওঠেন বোঝা। পাঁচ বছর আগে শেষ পর্যন্ত তার ঠিকানা হয়ে যায় এই বৃদ্ধাশ্রম। তিনি বলেন, ঈদ এলে আগের দিনের কথা খুব মনে পড়ে। তখন মনে হয়, যদি আবার সেই দিনগুলো ফিরে পেতাম।
ঈদের কথা উঠতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আবু তাহের (৭৫) ও তার স্ত্রী লাইলী বেগম (৬২)। চার বছর ধরে তারা এই বৃদ্ধাশ্রমে থাকছেন। আবু তাহের বলেন, আমাদের চারটা ছেলে-মেয়ে আছে। কিন্তু চার বছরেও কেউ আমাদের নিতে আসেনি। ঈদের সময়ও না। লাইলী বেগম যোগ করেন, এখানে অনেকের পরিবারের লোকজন আসে। শুধু আমরা কয়েকজন পড়ে থাকি। কথা শেষ করতে পারেন না তারা। চোখ ভিজে ওঠে দুজনেরই।
মেহেরুননেছা বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আপেল মাহমুদ জানান, এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এখানে থাকা অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা অসুস্থ। তাদের নিয়মিত সেবা-যত্ন করতে হয়।
তিনি বলেন, অনেককে সময়মতো গোসল করাতে হয়, অনেককে আবার খাইয়েও দিতে হয়। সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুদানেই প্রতিষ্ঠানটি চলছে। সমাজের বিত্তবানদের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই মানুষগুলো এক সময় পরিবারের জন্য সবকিছু করেছেন। এখন তাদের শেষ বয়সটা যেন একটু স্বস্তিতে কাটে, সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
ঈদের আনন্দ যখন দেশের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই বৃদ্ধাশ্রমের অনেক বাসিন্দার কাছে উৎসব মানে শুধুই স্মৃতি আর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস। সন্তান থাকা সত্ত্বেও স্বজনহীন হয়ে কাটে তাদের ঈদ-নিঃসঙ্গ, নির্জন, আর গভীর বিষণ্নতায় ভরা
সময়ে আলো/জোই