ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে ঢোকার আগেই গাইবান্ধা রেলওয়ে স্টেশনের বাতাস বদলে যায়। দূর থেকে হুইসেলের শব্দ ভেসে আসতেই অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড় হঠাৎ সজাগ হয়ে ওঠে। কেউ ব্যাগ শক্ত করে ধরে, কেউ শিশুকে কোলে তুলে নেয়। ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যায়-দরজা, জানালা, এমনকি ছাদ জুড়ে মানুষ। ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই, তবু নামার আগেই কেউ কেউ উঠে পড়ছেন ছাদে।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এ যেন এক চেনা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। তবু প্রতিবারই এই ভিড়, এই তাড়াহুড়া, এই ঝুঁকি নতুন করে চোখে পড়ে।
ঈদের আগে গত সোমবার ছিল শেষ কর্মদিবস। মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে টানা ছুটি। শুক্র অথবা শনিবার দেশজুড়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবার কথা রয়েছে। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন লাখো মানুষ।
বুধবার (১৮ মার্চ) সকাল থেকে গাইবান্ধা রেলওয়ে স্টেশনে সেই ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে। ভোর থেকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনগুলোর যাত্রীদের ভিড়ে প্ল্যাটফর্ম যেন এক চলমান জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। কেউ অপেক্ষায়, কেউ নামার তাড়ায়, কেউবা দ্রুত বাড়ির পথে রওনা হওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
স্টেশনের এক পাশে রিকশা-ভ্যানচালকদের ডাকাডাকি, অন্য পাশে স্বজনদের খোঁজে মোবাইলে ব্যস্ততা- সব মিলিয়ে যেন এক আবেগঘন, অস্থির অথচ প্রত্যাশায় ভরা পরিবেশ।
এই ভিড়ের মধ্যেই চোখে পড়ে আরেকটি বাস্তবতা— ঝুঁকির সঙ্গে আপোশ। যাত্রীচাপ এতটাই বেশি যে অনেক ট্রেনের ভেতরে দাঁড়ানোর জায়গাও মিলছে না। ফলে বাধ্য হয়েই অনেকে উঠে পড়ছেন ট্রেনের ছাদে, কেউ ঝুলছেন দরজায়, কেউবা ইঞ্জিনের পাশে বসে যাত্রা করছেন।
সকালবেলায় ঢাকা থেকে লালমনিরহাটগামী আন্তঃনগর লালমনি এক্সপ্রেস স্টেশনে ঢুকতেই দেখা যায়- ছাদ জুড়ে সারি সারি মানুষ। বিকেলে বুড়িমারি এক্সপ্রেস আর সন্ধ্যায় রংপুর এক্সপ্রেসেও একই চিত্র। ভেতরে জায়গা না পেয়ে অনেক যাত্রী ছাদকেই বেছে নিচ্ছেন শেষ আশ্রয় হিসেবে।
ঢাকা থেকে কাউনিয়াগামী ইমরুল কায়েস স্ত্রী ও ছোট সন্তানকে নিয়ে ছাদেই বসেছিলেন। গাইবান্ধায় ট্রেন থামলে তিনি বলেন, ভেতরে জায়গা পাইনি। বাচ্চা নিয়ে ছাদে উঠেছি- ঝুঁকি আছে জানি। কিন্তু ঈদের আগে বাড়ি না গেলে মন শান্তি পায় না।
একই ট্রেনের ছাদে বসা আয়েশা খাতুনের চোখে ক্লান্তি, কণ্ঠে দৃঢ়তা, স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করব। এই জন্যই এত কষ্ট করেও বাড়ি যাচ্ছি।
টাঙ্গাইল থেকে ওঠা ফরহাদ আলম অবশ্য কিছুটা স্বস্তির কথা জানান, শুরুতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গাইবান্ধায় এসে বসতে পেরেছি। ভিড়টা খুব বেশি।
রেলওয়ে সূত্র বলছে, কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা লালমনি এক্সপ্রেস, বুড়িমারি এক্সপ্রেস ও রংপুর এক্সপ্রেস- সব ট্রেনেই যাত্রীচাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। স্টেশনে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা নিয়মিত মাইকিং করে যাত্রীদের ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। পাশাপাশি মোবাইল চুরি ও প্রতারণা এড়াতে অপরিচিত কারও দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করার সতর্কবার্তাও দেওয়া হচ্ছে।
গাইবান্ধা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার সুমিত সরকার বলেন, ট্রেনগুলোর কোনো শিডিউল বিপর্যয় নেই। নির্ধারিত সময়েই চলাচল করছে। তবে ঈদ উপলক্ষ্যে যাত্রীচাপ অনেক বেশি, তাই ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রতি বছর ঈদ এলেই এমন চিত্র ভেসে ওঠে দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশনে। প্রশ্ন ওঠে- ঝুঁকি জেনেও কেন মানুষ এমনভাবে যাত্রা করে?
উত্তরটা সরল, কিন্তু গভীর শহরের ব্যস্ততা, দূরত্ব আর ক্লান্তির ভেতরেও যে টান মানুষকে টেনে নিয়ে যায়, সেটাই ‘নাড়ির টান’। সেই টানেই মানুষ ছুটে যায় গ্রামের বাড়িতে- যেখানে অপেক্ষা করে প্রিয়জন, যেখানে ঈদের সকাল মানে একসঙ্গে হাসি।
তবে এই চিরচেনা দৃশ্য আমাদের আরেকটি বাস্তবতাও মনে করিয়ে দেয়- পর্যাপ্ত পরিবহণব্যবস্থা, নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা এবং যাত্রীসেবার উন্নয়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে।
ঈদের আনন্দ যেমন মিলনের, তেমনি তা হওয়া উচিত নিরাপদও। কিন্তু বাস্তবে, সেই নিরাপত্তার ঘাটতি পুষিয়ে দিচ্ছে মানুষের আবেগ- ঝুঁকি নিয়েই, তবু নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা।
সময়ের আলো/জোই