‘হৈমন্তী পাহাড়ে
পাতা ঝরে, ধারাসারে
রহ গো ক্ষণিক
আরও একটু দেখতে দাও
আমার প্রিয়ারে।’
বাশো গাছ
তখন ওয়ি নদীর তীরে শূন্যতার ব্যাখ্যা করে চলে— বাশো গাছ। সেই গাছ হতে নেমে পড়ি ভীষণ ভয়ে; আর পাক খাই ফণাধর নাগের চতুর্পাশে। শ্যারনের রূপ ধরে জ্বলেছে যে কয়লা, তারই আলোতে রাতভর সারাশিনা লিখি— নীল কালি দেখি ফুরিয়ে যায় ক্রমে, অবসন্ন যখন রূবাহর হাত। অথচ ভিক্ষার প্রথম থালাটি আজও রয়েছে পরিত্যক্ত। আমার মতো তারও কোনো সঙ্গী নেই।
গোপন মার্মেড
অনেককাল আগে তুমিই হয়েছিলে আমার এক গোপন মার্মেড। শিকারী বন্দিশ হলো এই— বিদূষক আমি, অন্ধত্ব প্রাপ্তি হওয়া উরাশিমা তারো! অন্তিম শূন্য হতে কবে যেন ঢুকেছিলাম এক সামুদ্রিক ড্রাগনের ঝড়ে। বেরোতে পারি না আর বোগেনভিলিয়ার রূপ হতে। বাষ্পে ভেসে ওঠে তার স্নায়ুতন্ত্র, মর্মঠোঁট আর প্রশ্নমুখর পাখাখানি। ভয়ার্ত সব দৃশ্য দূর ভবিষ্যৎ হতে ফিরে আসে— যেখানে বসে আছে পৃথিবীর শেষ রিউগু-জো, অন্তিম মঠ। আরও কিছু আঁধার, মৃত শালিকের মুখ এখন প্রার্থনায় চেয়েছি; তবুও কোনো উত্তর মিলেনি। তাই পিথাগোরাসের মতো আজও তোমার লাঞ্ছিত রূপের ব্যাখ্যা করি, প্রবেশ করি নর্তকীর অন্তরীক্ষের ভেতর। হয়ত কখনও হবে সমস্তই একবার তুচ্ছতর চোখে দেখা।
রিডিকিউলাস এক সাপের বর্ম
সকলেই আজ প্রোটাগোনিস্ট— নিজেকে জেনেছে ভুল, এসে চিরস্থায়ী হাকিমের গল্পে। সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ আমার সাথে এখন আত্মপ্রবঞ্চনার ফাঁদে আলোকপ্রাপ্ত কুকুরের স্বপ্নগুলো দেখে। তাই ফুল আজ ফোটে ভীষণ আর্তনাদে, লুপ্ত কোনো পরাজিত প্রেমে। তোমার গৃহের পাশে ভৃঙ্গরাজ নিয়ে গিয়েছি সেদিন, গ্রহণ করোনি শিরি, সূর্যাস্ত দেখে জানিয়েছো পরিতাপমুখর এক অন্তিম বিদায়!
দুনিয়ার মর্ম বোঝা শেষ হলে, যতই ভাঙো না কেন রিডিকিউলাস সাপের বর্ম, এই সাংচুয়ারির থিতু অরণ্যে চির একা তুমি। আমাকে দ্যাখে যে ফিরোজা রঙের আয়না, সে’ই ছিল একমাত্র সাক্ষী— যক্ষ, তুলোরেখা, স্যাবোটাজ সংসার সমস্তই আজ ভালনারেবল। নিজেকে দেখেছি এতটা কাল হন্তারক আমি, ধ্বংসের কিনারে হেঁটে এখন রিগোরাস প্রায়। তোমার বিহ্বল চোখে যত অহিংস মতবাদ, আজ তা কেবলই অতীত দৃশ্যে থাকা তিক্ত মুখোশ। হাহাকার ধ্বনিতে ঘনিয়ে আসা মুহূর্তের শেষ বার্তাটুকুও— তোমার কাছে এখন অচেনা, দুর্বোধ্য লীলার মতো ফাঁকা।
গিলগামেশের দেশে
আমাদের কত গল্প অযুৎ মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে, কতটা বাণীমুখর, ভিন্ন তার অন্ধকার মেশানো গান। তোমাকে দেখে মনে হলো, ভীষণ নীহারিকাপুঞ্জ নিয়ে সাজিয়েছো নিজেকে। আর আমাকে দেখো, মৃত প্রান্তরে রুপালি চাঁদের চতুর্দিকে প্রণয় প্রণয় বলে ভিক্ষা করি শালপাতার জীবন। হঠাৎ শ্রমণসিদ্ধ হই। অমৃত ফলের বাসনায় হয়েছি মিলিন্দ। আমাদের বহু রাত এই মৃগয়ার জগতে ছড়িয়ে আছে। গিলগামেশের দেশে এসে, হাজারও রূপকথা বিধুর অন্ধকারে, কৌতুকে ভাসমান! স্মৃতির মতো এভাবেই একা একটি নক্ষত্রের রাতে নিজড়তা অভিমুখে বসে, সমুদ্রের তীরবর্তী জলে, আজ তবু তার কিছুটা বলা হলো। তারপর অফুরন্ত অক্ষর, সীমিত স্বপ্নযান ছেড়ে, তুমি চলে গেলে গার্গী। আমাকে বিনীতবাক্যে শূন্য করে, তুমিও চলে যেতে পারো।
উইলো
গতকাল ঘুমের মাঝে জেগে দেখি একটি অবিনাশী বিন্দুর ভেতর বসে আছো— তুমি আর সান কিরো। লেখা হয় দূরে, এখানে অনন্ত ভুল পথ আমাদের। নিয়তির অন্তরালে, সমস্ত আলো ভেদ করে কখনও নেমে আসে ঐ শব্দভেদী ফুজি পাহাড়। এখানেই শেষ হয় রূপকথার মর্মমুখী এক জীবনের। তারও কোনো বস্তুগত অর্থ নাই। যেন ছায়ামূর্তি হতে নিয়েছি তোমার অজর ঘ্রাণ, এক অবহেলিত রূপের শেষ হলে, আমাকে দাও বেদনামুখর আরও এক সুফিচিন্তা, উইলোর ডাক। মৃত হাসি তার অজস্র ঝরে পড়ে বাদামি রঙের আলো হতে দূরে। অথবা এই নক্ষত্র সুমেরুর কাছে, পরাজিত পাথর হয়েছে কোনো মন্ত্রসিদ্ধ ক্রেন। যেন কেউ আরেকটিবার উইলো হওয়ার দিকে— পড়ে থাকে বিন্দুতে, বরফে নাকি শেষ বাদুড় ধরার চোখে!