১.
‘আব লাগতা হেঁ ঠিক কাহা থা গালিব নে,
বাড়তে বাড়তে দার্দ দাওয়া বান যাতা হে।’
-মদন মোহন দানিশ
মানুষ শেষ পর্যন্ত তো দুঃখের সন্তান। বেদনা তাকে পেলে পোষে বড় করে। সমস্ত দিনের পর পায়ের নীচে শীতের শুকনো পাতার মতো বেদনাগুলো মর্মর ধ্বনিতে হাহাকার করতে থাকে। আমরা সেই যন্ত্রণা আর বেদনাকে ঘিরে গোল হয়ে বসি। অবাক চোখে তার নৃত্য দেখি, শুনি তার গান। সে বিষণ্নতাকে বাজার ফেরত কিশোরের হাতে থাকা লজেন্সের মতো লুকিয়ে রাখে৷ আর সতর্ক চোখে এদিক সেদিক তাকায়৷ আমিও তার সঙ্গে বেড়ে উঠি। একই গাছের নিচে হাত ধরে বসি। লোকে আমাদের দেখে হাসে, শিশুরা পাথর ছুড়ে মারে। আমরা অন্য কোথাও যাই। তারাও তাড়িয়ে দেয়৷ হাতির কানের মতো বিশাল এই পৃথিবীর পথে আমরা হাঁটতে থাকি। শুধুই হাঁটতে থাকি, আমি আর আমার যন্ত্রণা পাশাপাশি হাঁটি।
২.
শাহে জান মর জেছম-রা-বীঁরা কুনাদ;
বা'দ বীরা নিশায় আবা-দাঁ কুনাদ।
(খোদা আগে ধ্বংস করে দেন, তারপর গড়ে তোলেন আরও নিপুণভাবে)
-রুমি
রক্তের গড়িয়ে যাওয়া দেখি৷ রক্ত গড়িয়ে কোথায় যায়? কোন ঠিকানায় পোস্ট হয়ে যায়? রক্ত, শরীর আর রুহ- কে কাকে মানুষ করে তোলে? মানুষ কি গড়িয়ে যাওয়া রক্ত নাকি নিথর হয়ে থাকা শরীর? আর আত্মা, যাকে কেউ দেখে না সেই কি তবে মানুষ? এসব ভাবতে ভাবতে প্রতি রাতে আমি মানুষ গুনি। গুনতে গুনতে রাত ভুল করে ফেলি। তবু প্রতিদিন নিয়ম মেনে রাত আসে। রাত আসলেই আমি মানুষ গুনি। প্রতিদিন সংখ্যায় তারা কমতে থাকে। এখন আর কোনো মানুষ দেখি না। দেখি রক্ত, শরীর আর রুহ৷ প্রত্যেকে আলাদা আলাদা সত্তা। যাদের মাঝে একটি ছুরি নিজেই খুন হয়ে বসে আছে।
৩.
এই যে আমাদের ভালো না লাগার রোগ। একটা ইটারনাল বিষণ্নতা বয়ে বেড়ানো, এটা যেন পূর্ব পুরুষের কাছ থেকে পাওয়া কোনো ক্রুশ। যা কাঁধে নিয়ে হাঁটতে হবে পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত। যার কোনো শুরু কোনো শেষ নেই। তেমন বেদনার ভার সারাজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন জা ভলজা, যার কবর ফলকের ওপর কোনো নাম নেই। পরে কে যেন চারটা লাইন লিখে রেখে গেছে, 'সে এখন ঘুমিয়ে আছে, জীবনে কিছুই পায়নি সে।' একই দুঃখ আমৃত্যু টেনে নিয়ে গেছেন দন কিহোতোও। মৃত্যুর সময় যিনি তার সমস্ত ‘অভিযান'কে ছুড়ে ফেলে গিয়েছিলেন৷ যদিও সমস্ত ঝড়ঝাপটা সামলানোর পর কাঁদিদের মনে হয়েছে, 'আমাদের কর্তব্য আমাদের বাগান চাষ করা।' আসুন সবাই বাগান চাষ করি৷
৪.
প্রতিদিন সে হ্রস্বগুলো জড়ো করত। সে জানত পৃথিবীতে একদিন হ্রস বলে কিছু থাকবে না৷ বিজলির সেই চমক, অবিন্যস্ত ট্যাটুগুলোও আর থাকবে না৷ শি ট লা র মৃত। কিন্তু চিন্তাগুলো ছড়িয়ে আছে ডরমিটরিগুলোয়। তার বাবা ছিল ট্যাক্সিডার্মিস্ট। হিচককের সাইকোর ভেতর সে সারাদিন বসে বসে ডিম পাড়ত৷ ঘোড়া কিংবা গাধার ডিম। আমরা হ্রস্বগুলোর সঙ্গে সেই ডিমও কুড়িয়ে নিতাম৷ আমরা জানতাম, একদিন পৃথিবীতে ডিম বলেও আর কিছু থাকবে না। যেমন থাকবে না লেজওয়ালা মানুষ। আমরা মূলত নিজেদেরই ক্লান্তির যমজ। ক্লান্তিগুলো আমাদের তৈরি করেছে মানুষের মতো করে। অকর্মা ও নির্বোধ। ফলে আমরা জিরাফের কাছ থেকে গলা এবং বাঘের কাছ থেকে ধার নিয়েছি ডোরা।
৫.
সহজ কথা বলে কিছু নেই আসলে। সব সহজ হয় না। গাছের পাতায় বৃষ্টির শব্দ কি সহজ কিছু? কিংবা ফেয়ারওয়েল এঞ্জেলিনা? নাহ, বাঙ্কসি কিংবা গোল্ডিনও সহজ হয় না। কঠিন বললেই তুমি বোঝ শুধু ইউলিসিস, কমলকুমার কিংবা তারকোভস্কি। অথচ সারিবদ্ধভাবে পিঁপড়ের চলাচলও কঠিন। যেমন কঠিন ভাস্কর বুয়ার কখনো না শোনা খেয়াল। তুমি চাইলে ফৈয়াজ খাঁর 'বাজুবন্ধ খোল খোল যায়ে'ও শুনতে পার। নয়তো বসে থাক, এখন যেভাবে আছ। বসে থাকার ভেতর আছে পরশু দিনের ফেলে দেওয়া বাসি খাবারগুলো। আর আছে বাস্তুসংস্থান। এরপরও তুমি অবশ্য ভাবতে পার, কীভাবে একজন বাদি রাত হলেই কবরে মাটি দেওয়ার মানুষ খুঁজতে যায়। সবার উচিত আগে থেকে কবরে মাটি দেওয়ার মানুষ খুঁজে রাখা। আমিও রেখেছিলাম, তুমুল বৃষ্টিতে খাটসহ আমাকে ফেলে গেছে রাস্তায়। একটু আগে আমি মিশে গেছি জলধারায়। তুমুল অট্টহাসি ও চ্যাপলিনের ভঙ্গীর ভেতর।