সুন্দরবনের গল্পে মোহসীন উল হাকিমের সঙ্গে ১০ লাখ মানুষ
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬, ৬:১০ পিএম
মহসীন উল হাকিম। সংগৃহীত ছবি
একসময় ছিলেন তুখোড় সাংবাদিক। অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণধর্মী সংবাদের জন্য অনন্য ছিলেন। সুন্দরবনের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। নিজেই উদ্যোগ নেন বনদস্যুদের ভয়ংকর কর্মকাণ্ড ঠেকানোর। তখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় যে মানুষটির হাত ধরে একে একে পুরো সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হয়েছিল, তিনি হলেন সাংবাদিক মোহসীন উল হাকিম।
কিছুদিন আগেও সুন্দরবনের ত্রিশেরও অধিক জলদস্যু বাহিনীর ভয়ে তটস্থ থাকতো উপকূলবাসী। এখন সেই দিন এখন বদলেছে। সুন্দরবনকে জলদস্যু মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ৩১ মে থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনের মোট ৩২টি বাহিনীর দস্যু সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেছে। আর এ আত্মসমর্পণের নেপথ্যে সরকার ও জলদস্যুদের মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছেন সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিম।
সুন্দরবনে জেলেদের সঙ্গে সাংবাদিক মহসীন উল হাকিম। ছবি : সগৃহীত
২০০৯ সালে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের হয়ে প্রতিবেদন করতে সুন্দরবনের নিকটবর্তী বাগেরহাটের গাবুরায় যান মোহসীন উল হাকিম। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন সুন্দরবনের জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যের কথা। কথায় কথায় স্থানীয় এক ভুক্তভোগী তাকে বলেন, আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু দস্যুদের তো ঠেকাতে পারব না। আমাদের বাঁচান, পারলে দস্যুদের ঠেকাতে কিছু করুন।
কথাটি নাড়া দিল মোহসীনের হৃদয়ে। ভাবলেন, পেশাদারিত্বের বাইরে গিয়েও দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে কিছু দায়-দায়িত্ব আছে, এ দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সেই থেকে শুরু সুন্দরবনকে মোহসীনের দস্যু মুক্ত করার যুদ্ধ। এরপর গত ১২ বছর ধরে তিনি কয়েকশ বার গেছেন সুন্দরবনে। ঘুরে রেড়িয়েছেন জলদস্যুদের সঙ্গে। তাদের আস্তানায়, তাদের ডেরায় কাটিয়েছেন দিনের পর দিন।
বনদস্যুদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলে বুঝতে পারলেন, তারাও হিংস্রতা ছেড়ে ফিরতে চায় স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু পরবর্তী জীবনের অনিশ্চয়তা ও উপযুক্ত সুযোগের অভাবে এ পথে পা বাড়াতে পারছে না তারা। মোহসীনের সদাহাস্য উজ্জ্বল চেহারা আর সাবলীল কথাবার্তা জলদস্যুদের মনে দারুণ আস্থা জুগিয়েছে। আর এই আস্থাই পরবর্তী পথটুকু সহজ করে দিয়েছে।
সুন্দরবনে জেলেদের সঙ্গে সাংবাদিক মহসীন উল হাকিম। ছবি : সগৃহীত
মোহসীন বলেন, আমি সুন্দরবনকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করি। একটা সময়ে এসে বুঝেছি শুধু দূর থেকে সংবাদের মাধ্যমে সুন্দরবনের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই পেশাদারিত্বকে ছাপিয়ে দিনের পর দিন সুন্দরবনে গিয়ে থেকেছি, তাদের সাথে মিশেছি, সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করেছি।
সুন্দরবনের জীবন নিয়ে তার তৈরি নানা ভিডিও কন্টেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন মোহসীন। এখনও ধারাবাহিকভাবে কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি তার ইউটিউব চ্যানেলে ১০ লাখ ফলোয়ার পূর্ণ হয়েছে। এছাড়া ফেসবুক পেজেও ১৮ লাখ ফলোয়ার রয়েছে।
নিজের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে দর্শক ও অনুসারীদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মোহসীন উল হাকিম।
মোহসীন উল হাকীমের ছেলেবেলা কেটেছে নওগাঁতে। প্রাথমিকের হাতেখড়ি নওগাঁ কেডি স্কুল থেকে। এরপর রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করছেন। সম্প্রতি মোহসীন তার দীর্ঘদিনের সুন্দরবনের অভিজ্ঞতা ও জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের ঘটনা নিয়ে 'জীবনে ফেরার গল্প' নামের একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।