ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি ও কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। হামলার ঘোষণা দিয়ে তা স্থগিত রাখতে বাধ্য হওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট বলছে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত হামলা স্থগিত রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হয়েছে। ট্রাম্প পাঁচ দিনের জন্য হামলা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেখানে তিনি দাবি করেছেন ‘ফলপ্রসূ আলোচনার’, কিন্তু ইরান এই আলোচনার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছে।
ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত ইরানের পাল্টা হুমকিও বিবেচনায় নিতে হয়েছে। তেহরান প্রথমে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট ধ্বংস, হরমুজ প্রণালী বন্ধ এবং ইসরায়েলের ওপর আরও জোরালো হামলা করা হবে। তবে জাতিসংঘ সতর্কতার পর ইরান নিজেদের অবস্থান কিছুটা সহজ করেছে এবং জানিয়েছে, তারা মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্রকে লক্ষ্য করবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন আমরা পানি সরবরাহে আঘাত করব, এটি সত্য নয়। তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত করলে, আমরাও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেব।
এই পাঁচ দিনের যুদ্ধবিরতি উপসাগরীয় দেশগুলোকে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েছে এবং ইরানের বিকেন্দ্রীভূত সামরিক কাঠামোকে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দিয়েছে। ট্রাম্পও নিজেদের পরিস্থিতি নতুন করে মূল্যায়ন করতে পেরেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এখন চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। তেহরানের পাল্টা হামলা বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি করেছে। নভেম্বরের নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি দামের বৃদ্ধিও ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েল আগেই ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালিয়েছে, যা কাতারের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে তরলীকৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে। ট্রাম্প পরে ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে বলেছেন।
বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সরকার পরিবর্তনের জন্য বোমা হামলার পরিকল্পনা করলেও ইতিহাস দেখায়, পরাশক্তির হুমকি বাস্তব প্রয়োগের চেয়ে অনেক সময়ই বেশি কার্যকর।
ট্রাম্পের সামনে চারটি ঝুঁকিপূর্ণ ‘অপশন’ রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপদজনক হতে পারে। ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের উদাহরণ, আফগানিস্তান যুদ্ধ এবং বারাক ওবামার সিরিয়ায় পদক্ষেপ না নেওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতে পরাশক্তি ও পরাশক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের হুমকি দেওয়ার পর, ইরানও পাল্টা সতর্কবার্তা দিয়েছে—উপকূলে হামলা হলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা হতে পারে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি এক ধরনের ‘গেরিলা কৌশল’, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পুরোপুরি বিবেচনা করেনি। ইরানের এই হুমকি পরীক্ষা যুক্তরাষ্ট্র কি বাস্তবে ঝুঁকি নেবে? এই ঝুঁকি নিলে বিশ্ব তেলের ২০% এবং ইউরোপের বড় অংশের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে দ্বৈততা স্পষ্ট, একদিকে যুদ্ধ কমানোর ইঙ্গিত, অন্যদিকে হুমকি। উপসাগরীয় দেশগুলোর শহরগুলো গ্যাস-তেল ও পানি বিশুদ্ধকরণের ওপর নির্ভরশীল। ইরানের পররাষ্ট্রনীতি শিয়া মতবাদের কঠোর ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং দেশটিকে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হবে এমন বিশ্বাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান তৈরি হয়েছে।
ইরান নিজেকে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, যার মধ্যে হুথি, হিজবুল্লাহ, হামাস, আসাদ সরকার এবং ইরাকের মিলিশিয়ারা অন্তর্ভুক্ত। তেহরান হরমুজ প্রণালিতে ভারতীয় ও পাকিস্তানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়ে পরিস্থিতি কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।
ইরানের সরকার এখনও ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখায়নি এবং জনগণের মধ্যে বড় ধরনের বিদ্রোহ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষণ অনুসারে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর শুরু করা যুদ্ধের মূল মূল্য আদায় করতে চাইছে ইরান, কিন্তু তাদের মিত্ররা প্রস্তুত নয়। এভাবেই একটি পরাশক্তি পরাস্ত করা যেতে পারে।
/ইউএমএইচ