ঈদ যায় স্বজন আসে না

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

ঈদে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরে অসংখ্য মানুষ। ঈদের দিন সকালে ঘরে ঘরে নতুন পোশাক, অতিথি

2026-03-25T02:13:34+00:00
2026-03-25T02:13:34+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
ঈদ যায় স্বজন আসে না
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬, ২:১৩ এএম 
মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রমে মিলেছে এই প্রবীণজনদের। ছবি : সময়ের আলো
ঈদে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরে অসংখ্য মানুষ। ঈদের দিন সকালে ঘরে ঘরে নতুন পোশাক, অতিথি আপ্যায়ন, কোলাহল আর হাসির উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে বাড়ির আঙিনা। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানুষগুলোর নিঃসঙ্গতার এ উৎসবের দিনটিতে আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। সেখানে ঈদ মানে কয়েকটি দিন দুঃসহ স্মৃতির ভেতর মুখ লুকিয়ে অশ্রুসংবরণ করা আর অনিঃশেষ বেদনার ভার নিয়ে চুপচাপ থাকা। এই ঈদে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রমও সেই চিত্রই তুলে ধরে।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ছোট সোহাগী গ্রামে অবস্থিত মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রম। ঈদের দিন এখানকার উঠানে বসে আমিরুল ইসলাম পুরোনো দিনের কথা স্মরণ করছিলেন। তিনি বলেন, ঈদ এলেই মনে পড়ে যায় আগের দিনের কথা। বাড়িতে কত আয়োজন থাকত, কত মানুষ আসত। এখন সবই শুধু স্মৃতি।

তিনি জানান, ঈদ এলেই এখানকার অনেক বাসিন্দা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। কেউ পুরোনো দিনের সুখস্মৃতিতে ডুবে থাকেন, আবার কারও চোখ ভিজে ওঠে আপনজনশূন্যতায়। গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে এ বৃদ্ধাশ্রমটি ২০১৭ সালে গড়ে ওঠে স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে। শুরু থেকেই সর্বসাধারণের অনুদানে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এখানে আশ্রিত রয়েছেন ৩৯ জন। তাদের মধ্যে ২৪ জন নারী ও ১৫ জন পুরুষ।

তাদের অনেককেই বিভিন্ন সময় রাস্তা থেকে উদ্ধার করে এখানে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। কেউ হারিয়ে গিয়েছিলেন, কেউ বা পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছিলেন অপ্রয়োজনীয়। অথচ তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় কারও বাবা-মা ছিলেন, পরিবার গড়ে তুলেছিলেন নিজের শ্রম আর ত্যাগে।

ঈদের দিন আশ্রমের ঘরের ভেতরে কিংবা উঠানে বসে অনেকেই নীরবে চোখ মোছেন। বাইরে যখন আনন্দের উৎসব, তখন তাদের কাছে ঈদ যেন বিচ্ছিন্নতার প্রতীক। ঈদের কয়েক দিন আগে মঙ্গলবার কথা হয় বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা মজিরন বেওয়ার সঙ্গে। স্মৃতির ভেতর ডুবে গিয়ে তিনি বলেন, আমার স্বামী, দুই ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল সংসার। ঈদের সময় বাড়িতে কত আয়োজন হতো। 

অতিথি আসত, আমরা আত্মীয়দের বাড়ি যেতাম। কথা বলতে বলতে থেমে যান তিনি। ভারী হয়ে আসে কণ্ঠ। দশ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তার জীবন। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় আর ছেলেদের সংসারে তিনি হয়ে ওঠেন বোঝা। পাঁচ বছর আগে শেষ পর্যন্ত তার ঠিকানা হয়ে যায় এ বৃদ্ধাশ্রম। 

তিনি বলেন, ঈদ এলে আগের দিনের কথা খুব মনে পড়ে। তখন মনে হয়, যদি আবার সেই দিনগুলো ফিরে পেতাম।

ঈদের কথা উঠতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আবু তাহের ও তার স্ত্রী লাইলী বেগম। চার বছর ধরে তারা এ বৃদ্ধাশ্রমে থাকছেন। তাদের চার সন্তান থাকলেও কেউ খোঁজ নিতে আসেন না। 

আবু তাহের বলেন, আমাদের চারটা ছেলেমেয়ে আছে। কিন্তু চার বছরেও কেউ আমাদের নিতে আসেনি। ঈদের সময়ও না।

লাইলী বেগম যোগ করেন, এখানে অনেকের পরিবারের লোকজন আসে। শুধু আমরা কয়েকজন পড়ে থাকি। কথা শেষ করতে পারেন না তারা। চোখ ভিজে যায় দুজনেরই।

মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আপেল মাহমুদ জানান, এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এখানে থাকা অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা অসুস্থ। তাদের নিয়মিত সেবা-যত্ন করতে হয়।

তিনি বলেন, অনেককে সময়মতো গোসল করাতে হয়, অনেককে আবার খাইয়েও দিতে হয়। সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুদানেই প্রতিষ্ঠানটি চলছে।

সমাজের বিত্তবানদের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই মানুষগুলো একসময় পরিবারের জন্য সবকিছু করেছেন। এখন তাদের শেষ বয়সটা যেন একটু স্বস্তিতে কাটে, সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।

ঈদের আনন্দ যখন দেশের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এ বৃদ্ধাশ্রমের অনেক বাসিন্দার কাছে উৎসব মানে শুধুই স্মৃতি আর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস। সন্তান থাকা সত্ত্বেও স্বজনহীন হয়ে কাটে তাদের ঈদ-নিঃসঙ্গ, নির্জন, আর গভীর বিষণ্নতায়।

সময়ের আলো/আরবিএন 
  বিষয়:   ঈদ  পরিবার  স্বজন  গোবিন্দগঞ্জ  উপজেলা  মেহেরুন্নেছা  বৃদ্ধাশ্রম 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: