দৌলতদিয়া ঘাটে প্রায় ৫০ জন যাত্রী নিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গেছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযানে নেমে পদ্মার পানির ৩০ ফুট গভীরে পন্টুনের নিচে বাসটির সন্ধান পেয়েছেন। এতে বাসের কয়েকজন যাত্রী আগে থেকে নিচে নামলে তারা বেঁচে যান। কয়েকজন বাস পড়ে যাওয়ার সময় লাফ দিয়ে সাঁতরে তীরে উঠে আসেন।
ইতোমধ্যে এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত (বুধবার রাত ৯টা) ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। বাকি প্রায় ৪০ জনের মরদেহ পানির নিচে রয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল। সন্ধ্যার পরে ঝড়ের কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহতের কথাও জানিয়েছেন তারা। স্বজনদের আহাজারিতে যেন ভারী হয়ে উঠছে নদীর পাড়।
বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের এ বাসটি ফেরিতে উঠে গিয়ে নদীতে পড়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় জনগণ উদ্ধার তৎপরতা শুরু করছে।
সৌহার্দ্য পরিবহনের এক কর্মচারী জানান, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকাগামী বাসটিতে প্রায় ৫০ জনের মতো যাত্রী ছিল। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে পৌঁছালে ১০-১২ জন যাত্রী বাস থেকে নিচে নেমে যান। অবশিষ্ট যাত্রীদের নিয়ে বাসটি ঢালু অ্যাপ্রোচ সড়ক দিয়ে ফেরিতে উঠতে যাচ্ছিল। এ সময় সরাসরি পদ্মা নদীর গভীর জলে পড়ে তলিয়ে যায়। বাসটিতে অধিকাংশই পরিবারের সঙ্গে ঈদ আনন্দ শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেন বলেন, চোখের সামনে বাসটি পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে গেল। অথচ আমরা কিছুই করতে পারছিলাম না। এ সময় বাসে নারী-শিশুসহ অন্তত প্রায় ৪০-এর বেশি যাত্রী বাসের ভেতর ছিলেন। ইতিমধ্যে কয়েকজন যাত্রী ওপরে উঠতে পারলেও অধিকাংশ যাত্রী বাসের ভেতর আটকা পড়েছেন।
স্থানীয় ও বেঁচে যাওয়া বাসযাত্রীদের ভাষ্য মতে, ওই বাস থেকে ৫ থেকে ৭ জন যাত্রী শুরুতেই বের হতে পেরেছে। বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী যান হামজার সহযোগিতায় বাসটি তোলার চেষ্টা চলছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উদ্ধারকারী জাহাজ অনেক দেরিতে এসেছে। তা ছাড়া ফায়ার সার্ভিস ডুবুরি দলও এক ঘণ্টার বেশি সময় পর উদ্ধারকাজ শুরু করেছে। সাঁতরে বেঁচে ফেরা এক যাত্রী বলেন, তাকে (স্ত্রীকে) বলেছিলাম ২৯ মার্চ আমার ডিউটি আছে তোমরা বাড়ি থাকো, বউ শুনল না। বলল, আব্দুল্লাহর বাপ তোমারে না দেখলে আমার ভালো লাগে না। আমি বাড়ি থাকমু না। তোমারে না দেখলে আমার অস্থির লাগে। এখন আমার কী হবে, কেমনে বাঁচমু।
নদীর তীরে কাঁদতে কাঁদতে ওই যুবক আরও বলেন, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। স্ত্রী ও ছেলে আব্দুল্লাহকে নিয়ে তিনি বসে ছিলেন। হঠাৎ বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় উল্টে নদীতে পড়ে যায়। আমি সাঁতরে কোনো রকম তীরে উঠে আসি।
সৌহার্দ্য বাসে থাকা আবদুল আজিজুল নামে এক যাত্রী জানান, তিনি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার গান্ধীমারা এলাকা থেকে এই বাসটিতে উঠেছিলেন। নদীতে পড়ে যাওয়ার পর তিনি সাঁতরে ওপরে উঠতে পারলেও তার স্ত্রী ও শিশুসন্তান নিখোঁজ রয়েছেন। বাসটি কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে এসেছিল। খুবই অল্পসংখ্যক যাত্রী সাঁতরে ওপরে উঠতে পেরেছেন বলেও জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
৪০ জনের মরদেহ পানির নিচে : রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় এখনও ৪০ জনের মরদেহ পানির নিচে রয়েছে বলে ধারণা ফায়ার সার্ভিসের। এ ছাড়া দুই নারীসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতরা হলেন- রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর লাল মিয়া সড়কের মৃত ইসমাইল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার ও রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাংশা জোনাল অফিসের কর্মকর্তা মর্জিনা বেগম।
ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের কমান্ডার মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ৪০ জনের মতো যাত্রীর মরদেহ পানির নিচে রয়েছে। ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের দুজন ডুবুরি, দুজন সহকারী ডুবুরি উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ফায়ার সার্ভিসের একটি দল উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে।
দৌলতদিয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ অভিযান শুরু করে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরাও উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন।
পদ্মা নদীর ৩০ ফুট নিচে সন্ধান মিলল বাসের : ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযানে নেমে পদ্মার পানির অন্তত ৩০ ফুট গভীরে গিয়ে বাসটির সন্ধান পেয়েছেন। নদীতে পড়ার পর বাসটি পন্টুনের নিচে চলে গেছে। যে কারণে বাসের জানালা ও দরজা ভাঙা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ডুবুরি দলের সদস্যরা। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ডুবুরি দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, গোয়ালন্দ ফায়ার স্টেশনের ১টি ইউনিট এবং আরিচা ফায়ার স্টেশনের ১টি ডুবুরি ইউনিট উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। ঢাকা ও ফরিদপুর থেকে আরও ২টি ডুবুরি ইউনিট ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছে।
রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. হারুন-অর-রশিদ, জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়াসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন।
সময়ের আলো/আআ