দেশের ডিপোগুলোতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। মাত্র ১১-১২ দিনের ডিজেল আছে। কমছে অকটেন, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আটকে আছে অপরিশোধিত জ্বালানি (ক্রুড)। এতে ইস্টার্ন রিফাইনারি আগামী সপ্তাহে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। চলতি মাসে নির্ধারিত অন্তত আটটি অয়েল ট্যাঙ্কার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়নি। এতে চলমান জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দুভাবে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন সচল রাখে। এর মধ্যে আমদানি করে বেশিরভাগ জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ করা হয়। পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে বছরে ৬৫ লাখ থেকে ৬৭ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি হয়। দেশে বার্ষিক চাহিদাও প্রায় সমান। এর মধ্যে পরিশোধনের জন্য ক্রুড আমদানি করা হয় ১৫ লাখ টন। বাকি সবই পরিশোধিত তেল।
দেশের ডিপোগুলোতে সবসময় তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল রাখার চেষ্টা করা হয়। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় এটি করা হয়। কিন্তু চলতি মার্চে আমদানি সূচি এলোমেলো হয়ে পড়ায় ডিপোতে ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ডিপোগুলোর ধারণক্ষমতা বেশি হলেও বর্তমানে ডিজেল আছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিকটন, যা মোট ধারণক্ষমতার অর্ধেকেরও কম।
বর্তমানে সেচের ভরা মৌসুম। ডিজেলের চাহিদা বেশি। দৈনিক সাড়ে ১২ হাজার টন বিক্রি হচ্ছে ডিপোগুলোতে। কোনো দিন ১২ হাজার ৭০০ টন পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে মজুদে চলবে মাত্র ১১-১২ দিন। পাশাপাশি অকটেনও কমে ১০ হাজার টনে নেমেছে। দৈনিক হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টন বিক্রি হয়।
ইআরএলের উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ খান সময়ের আলোকে বলেন, চলতি মাসে দুটি ট্যাঙ্কারে ক্রুড আমদানির সূচি ছিল। কিন্তু কোনোটিই আসতে পারেনি। একটি ক্রুড ভর্তি করে সৌদি বন্দরে নোঙরে আছে। আরেকটি আমিরাতের বন্দরে যেতেই পারেনি।
এই অবস্থায় ইআরএলের স্টোরেজ ট্যাঙ্কে ক্রুড দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বর্তমানে যে পরিমাণ ক্রুড আছে, তা দিয়ে সর্বোচ্চ ৭-৮ দিন চলবে। এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ট্যাঙ্কার রওনা দিলেও দেশে পৌঁছাতে ১২ থেকে ১৪ দিন লাগবে। তাই ক্রুডের অভাবে ইআরএল বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প নেই।
তেল উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ক্রুড না আসায় বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে প্রতিদিন ২ হাজার মেট্রিকটন ডিজেল উৎপাদন হতো, এখন হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টন। দৈনিক ৫০০ টন উৎপাদন কমেছে।
দেশে অকটেনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, অকটেন ও পেট্রোল দুটিই ইআরএলে উৎপাদিত হয়, তবে পরিমাণে কম।
সংস্থাটির ব্যবস্থাপক বরুন বড়ুয়া বলেন, দৈনিক সর্বোচ্চ ২০০ টন অকটেন এবং ৩০০ মেট্রিকটন পেট্রোল উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমান মজুদ ক্রুড দিয়েই উৎপাদন চালু রাখা হয়েছে।
‘যার যা আছে তা নিয়ে মজুদ করছে’ : হঠাৎ অকটেনের চাহিদা বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন তেল কোম্পানির কর্মকর্তারা। আরও কমতে পারে- এমন আশঙ্কায় অনেকে যেভাবে পারছেন অকটেন মজুদ করছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি যমুনার উপমহাব্যবস্থাপক (সেলস) মোহাম্মদ হাসান ইমাম বলেন, বছরের এই সময়ে কখনো এত অকটেনের চাহিদা ছিল না। অস্বাভাবিকভাবে চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা বেশি নিচ্ছেন। এতে তেলের ঘাটতি নিয়ে প্যানিক তৈরি হয়েছে। যার যা আছে, তা নিয়েই অকটেন মজুদ করছেন। ফলে পেট্রোল পাম্পে সংকট দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি মাসের ১ মার্চ থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হয়েছিল। এরপর কোনো বিধিনিষেধ নেই। হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে গেছে। আগে দৈনিক এক হাজার টন অকটেন বিক্রি হতো না, এখন তা দিয়েও চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।
যা বলছেন পেট্রোল পাম্প মালিকরা : দেশে পেট্রোল পাম্পের সংখ্যা ২ হাজার ২০০। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ২০০টির বেশি। চট্টগ্রাম মহানগরীতে সচল আছে ৬৫ থেকে ৭০টি। সরকারি তরফে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই। এদিকে পাম্প মালিকরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। তাদের দাবি, দৈনিক চাহিদার অর্ধেকও দেওয়া হচ্ছে না। ফলে ডিপো থেকে ট্যাঙ্ক ভরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সাবেক সভাপতি এহসানুর রহমান চৌধুরী বলেন, তেল কোম্পানি কম সরবরাহ দিচ্ছে। ডিপো থেকে আনার ২-৩ ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। যদি আগেই বলে দেওয়া হয় তেল দেওয়া হবে না, তা হলে পাম্প বন্ধ রাখা সহজ হয়। অল্প অল্প দিয়ে দিয়ে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। তারা ক্ষুব্ধ আচরণ করছেন।
তিনি বলেন, দেশে মোটরসাইকেল সবচেয়ে বেশি। এরপর প্রাইভেটকার। দুই ধরনের যানবাহনের প্রধান জ্বালানি অকটেন। ঈদের বন্ধে বড় বাস-ট্রাক কম। বেশি চলেছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার। তাই অকটেনের চাহিদা বেড়েছে। আগামী শুক্রবার থেকে বাস-ট্রাক বাড়বে। ডিজেলের প্রয়োজনও বেশি থাকবে। আমদানিপ্রবাহ ঠিক না থাকায় সংকট আরও বাড়তে পারে।
২৩ দিন আটকা ক্রুডভর্তি মাদার ট্যাঙ্কার : সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিকটন ক্রুড ভর্তি করে নোঙরে আছে অয়েল ট্যাঙ্কার এমটি নরডিক পোলাক্স। গত ৩ মার্চ আরব লাইট ক্রুড ভরার পর চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। কিন্তু ২৩ দিন পার হলেও এটি এখনও সেখানে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশি শিপিং এজেন্ট প্রাইম ওশান লিমিটেডের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে হুরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ট্যাঙ্কার আনা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে আরেকটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দরে গিয়ে ক্রুডই তুলতে পারেনি।
পাম্পে কমেনি দীর্ঘ লাইন : বুধবারও নগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেল পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে অকটেনের চরম সংকট ছিল। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কেউ তেল পেয়েছেন, কেউ পাননি। যারা পেয়েছেন, তারাও চাহিদার তুলনায় কম পেয়েছেন। মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, ২ নম্বর গেট, টাইগারপাস, আগ্রাবাদসহ নগরী ও মফস্বলের প্রায় সব পাম্পেই সংকট ছিল। তবে আগের দুদিনের তুলনায় বুধবার সীমিত হারে সব ধরনের জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছে। পাম্পকর্মীদের ভাষ্য, ক্রেতারা চাহিদার চেয়ে বেশি নিচ্ছেন আবার ডিপো থেকেও কম দেওয়া হচ্ছে। দুই কারণেই সংকট বাড়ছে।
সময়ের আলো/আআ