নদীর জলে পুণ্যের খোঁজ

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

গাইবান্ধার নদ-নদীপাড়ে বছরের একটি দিন আসে, যখন ভোরের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন এক অভিন্ন বিশ্বাসে-পাপমোচন আর

2026-03-26T17:14:20+00:00
2026-03-26T17:14:20+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
নদীর জলে পুণ্যের খোঁজ
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ৫:১৪ পিএম 
অষ্টমী স্নানে আচার-অনুষ্ঠান আর লোকজ মেলার মহামিলন। ছবি : সময়ের আলো
গাইবান্ধার নদ-নদীপাড়ে বছরের একটি দিন আসে, যখন ভোরের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন এক অভিন্ন বিশ্বাসে-পাপমোচন আর পুণ্যলাভের আশায়। অষ্টমী তিথির সেই দিনটিতে জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর ঘাট, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদ তীর হয়ে ওঠে ধর্মীয় আচার, লোকজ সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনমেলার এক বিশাল আয়োজন।

চৈত্রের শেষ কিংবা বৈশাখের নির্দিষ্ট তিথিতে অনুষ্ঠিত এই অষ্টমী স্নানকে ঘিরে ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট, সদর উপজেলার কামারজানি, সুন্দরগঞ্জের তিস্তা তীর, গোবিন্দগঞ্জের নাকাই ও করতোয়া নদীর পাড়ে লাখো মানুষের ঢল নামে।

ভোর ৫টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল পর্যন্ত চলে এই স্নানের লগ্ন। নির্দিষ্ট সময়কে কেন্দ্র করে নদীর জলে নামার জন্য ভক্তদের মধ্যে দেখা যায় গভীর আগ্রহ ও আবেগ।

সরেজমিনে দেখা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে আগত পুণ্যার্থীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে নদীর তীরে জড়ো হন। কারও হাতে ফুল, বেলপাতা, ধান, দুর্বা; কেউ আবার ডাব, হরীতকী ও অন্যান্য পূজার সামগ্রী নিয়ে এসেছেন। নদীতে অবগাহনের আগে ও পরে চলে অর্চনা, প্রার্থনা ও দানের রীতি। অনেকেই স্নান শেষে প্রসাদ হিসেবে চিড়া, দই, মুড়ি ও খই ভাগাভাগি করে খান-যা উৎসবকে আরও মানবিক ও সামাজিক করে তোলে।

অষ্টমী স্নানের পেছনে রয়েছে পুরাণভিত্তিক বিশ্বাস। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মহাভারতের কাহিনি অনুযায়ী, পরশুরাম তার মা রেনুকা দেবীর অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে দেবতার নির্দেশে অষ্টমী তিথিতে দক্ষিণমুখী প্রবাহিত গঙ্গায় স্নান করেন এবং মুক্তি লাভ করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই অষ্টমী তিথিতে নদীতে স্নানকে পুণ্যফলদায়ী মনে করা হয়। 

গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র তীরেও এই আচার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে।

তবে এই আয়োজন শুধুমাত্র ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়। অষ্টমী স্নানকে ঘিরে নদীর তীরে বসে গ্রামীণ মেলা, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বালুর ওপর সারি সারি দোকান-মাটির হাঁড়ি-পাতিল, খেলনা, পুতুল, দেব-দেবীর মূর্তি, চিনির তৈরি জীবজন্তুর প্রতিকৃতি, খুরমা-বাতাসা থেকে শুরু করে নানা রকম খাদ্যপণ্য। শিশুদের হাসি, বিক্রেতাদের ডাক আর ক্রেতাদের ভিড়ে জমে ওঠে প্রাণবন্ত পরিবেশ।

স্থানীয়দের ভাষায় ‘বান্নি মেলা’ নামে পরিচিত এই আয়োজনের ইতিহাস শতবর্ষেরও বেশি। 

অনেকেই জানান, ছোটবেলা থেকে তারা এই মেলায় আসছেন, এখন নিজেদের সন্তানদেরও নিয়ে আসেন-একটি প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতা যেন এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই উৎসব শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সব ধর্মের মানুষ এখানে অংশ নেন, কেনাকাটা করেন, সময় কাটান। ফলে অষ্টমী স্নান গাইবান্ধায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হয়।

উৎসবকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। বিভিন্ন ঘাটে বাড়ানো হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পুলিশের টহল জোরদার করা হয়। নারী-পুরুষের জন্য আলাদা স্নানের ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও অস্থায়ী টয়লেট স্থাপন করা হয়, যাতে পুণ্যার্থীরা নির্বিঘ্নে আচার পালন করতে পারেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিবছরই লাখো মানুষের সমাগম ঘটে এবং এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই বিশাল জনসমাগম যেন একটি অস্থায়ী শহর; যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকজ ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একসূত্রে গাঁথা।

গাইবান্ধার অষ্টমী স্নান তাই কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি নদীঘেরা জনপদের মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মিলনের এক অনন্য প্রতিফলন। প্রতি বছর এই দিনে নদীর জলে অবগাহনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ খুঁজে ফেরে আত্মিক শান্তি, আর নদীতীর ভরে ওঠে জীবনের উচ্ছ্বাসে।



  বিষয়:   গাইবান্ধা  অষ্টমী  তিথি  আচার  লোকজ  সংস্কৃতি 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: