উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন। জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর নদীটি কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও চর রাজিবপুর হয়ে প্রবাহিত হয়ে গাইবান্ধা ও জামালপুরের বাহাদুরাবাদে গিয়ে যমুনা নদ নামে পরিচিত হয়।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণপুর থেকে রাজিবপুর পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকায় ১৯৫০ সাল থেকে চলমান ভাঙনে বদলে গেছে এই জনপদের ভূগোল ও মানুষের জীবনচিত্র। নদীভাঙনের কারণে নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার বহু ইউনিয়ন কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে। কয়েক লক্ষ মানুষ বারবার বসতভিটা হারিয়ে নতুন ঠিকানার সন্ধানে বাধ্য হয়েছেন। কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনাসহ বিপুল সম্পদ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্রহ্মপুত্র নদের বাম তীর সংরক্ষণে একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটির আওতায় রৌমারী, রাজিবপুর ও উলিপুর উপজেলার প্রায় ১৬ দশমিক ৩০৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির সম্ভাব্য মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা এলাকায় প্রায় ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, হবিগঞ্জ বাজার ও নামাজের চরে ৪ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার, সোনাপুর, ঘুঘুমারি ও সুখের বাতি এলাকায় ৬ কিলোমিটার, রৌমারীর ফুলুয়ার চরঘাট এলাকায় ১ দশমিক ৪০০ কিলোমিটার এবং রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি, হাজীপাড়া ও চর নেওয়াজী এলাকায় প্রায় ৪ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প এলাকার ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত সমীক্ষা সম্পন্ন করে তা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীতে গত ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আশেকুল হক বিষয়টি পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে প্রেরণ করেন। তবে এখনো প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের কণ্ঠে ধরা পড়েছে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের চিত্র।
উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক (৬৫) বলেন, এই নদী আমার সব শেষ কইরা দিছে। জীবনে ছয়বার ঘর বানাইছি, ছয়বারই নদীতে গইছে। এখন আর কই যামু, কই থাকুম কিছুই বুঝি না।
একই এলাকার গৃহবধূ রাহেলা খাতুন (৪০) বলেন, বাপের বাড়ি নাই, স্বামীর বাড়ি নাই। নদী সব নিয়া গেছে। দুইটা বাচ্চা নিয়ে অন্যের জমিতে থাকি। বর্ষা আসলেই বুক কাঁপে।
রৌমারী উপজেলার ফুলুয়ার চর এলাকার কৃষক আব্দুল গফুর (৫০) জানান, আমার ১০ বিঘা জমি ছিল, এখন কিছুই নাই। নদী সব খাইয়া ফেলছে। এখন দিনমজুরি করি। এইভাবে বাঁচা যায় না।
চর রাজিবপুর উপজেলার হাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা জাহিদা খাতুন (৩৫) বলেন, আমরা গরিব মানুষ। বারবার ঘর ভাঙে, আবার বানাই। কিন্তু আর পারতেছি না। সরকার যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয়, আমরা রাস্তায় বসে যাবো।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন বলেন, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে পুরো ইউনিয়ন বিপর্যস্ত। হবিগঞ্জ বাজার, নামাজের চর, সোনাপুর, ঘুঘুমারি ও সুখের বাতি এলাকার মানুষ পাঁচ-ছয়বার পর্যন্ত বসতভিটা বদল করেছে। দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে।
রৌমারী উপজেলার বন্দবের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের জানান, ফুলুয়ার চর এলাকা সবচেয়ে বেশি ভাঙনের শিকার। বহু পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
কোদালকাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির বলেন, হাজীপাড়া ও চর নেওয়াজী এলাকায় ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আগামী বন্যার আগে ব্যবস্থা না নিলে শত শত পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ব্রহ্মপুত্র একটি অত্যন্ত অস্থির প্রকৃতির নদী। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ মিটার করে তীর ভেঙে নদী প্রশস্ত হচ্ছে। এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে এবং মানুষ দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। শুধু তীর সংরক্ষণ নয়, নদীর নাব্যতা ঠিক রাখতে নিয়মিত ড্রেজিংও জরুরি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের বাম তীরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন রোধে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত অনুমোদন পাওয়া গেলে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে ব্রহ্মপুত্রের ভয়াল ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে কুড়িগ্রামের হাজারো মানুষ এবং স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে চরাঞ্চলের জনজীবনে।