বোরো ধানের ভরা মৌসুমে নাটোরে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি তেল ডিজেলের সংকট। সেচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্থানীয় বাজারে ও ডিপোগুলো চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন জেলার হাজারো প্রান্তিক কৃষক।
সেচ পাম্প চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারায় জমি ফেটে যাচ্ছে। এতে যেমন কৃষিতে উৎপাদনব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ— বাজারে এবং শহরে ঘুরে কোথাও তেল না পেয়ে পরে আধা লিটার, এক লিটার করে তেল এনে কোনোমতে সেচ পাম্প চালাতে হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ে এজেন্টরা সামান্য পরিমাণে ডিজেল দিলেও অনেক পাম্পমালিক চাহিদামতো সরবরাহ করছেন না।
আর পাম্পমালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদামতো সরবরাহ না থাকায় অর্ধেকেরও কম ডিজেল দিতে পারছেন তারা। নাটোরের বিল-হালতি-খোলাবাড়িয়া ও বৃহত্তর চলনবিলের মাঠে ঘুরে দেখা যায়, তেলের সংকটে কৃষিজমিতে চাষ করতে না পেরে কৃষক তার জমিতে নিজেই কোদাল দিয়ে চাষ করছেন। কেউ সামান্য তেল পেয়ে কৃষিযন্ত্র দিয়ে জমি প্রস্তুত করছেন। আবার কেউ বোরো আবাদের জমি ঘুরে ঘুরে দেখছেন।
তাদের মতে, এখন জমিতে পানির খুব দরকার অথচ দোকানে ঘুরেও ডিজেল পাচ্ছি না। পানির অভাবে জমির মাটি শুকিয়ে গেছে, ধানের গাছে লালচে ভাব ধরেছে। এভাবে চললে পথে বসতে হবে।
কৃষকদের অভিযোগ— অনেক দোকানে তেল থাকলেও তারা বিক্রি করছে না। আবার কোথাও কোথাও নির্ধারিত ১০৫ টাকার ডিজেল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, এমনকি এর থেকেও বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। ঈদের আগে থেকে তারা কোনো তেল পাচ্ছে না।
এদিকে জেলার ৩৩টি তেল পাম্প ও ২৫ জন ডিপো এজেন্টও চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছেন না। ডিজেল না পাওয়ায় অনেক কৃষক সেচ পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঢাল সড়ক এলাকার শামীম বলেন, ৪টি পেট্রোল পাম্পে গিয়েও ডিজেল পাইনি। শহরের হাফ রাস্তা পাম্পে গিয়ে মাত্র ২ লিটার ডিজেল পেয়েছি। এই ২ লিটার না পেলে ভুট্টার জমিতে সেচ বন্ধ রাখতে হতো।
নাটোর কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় মোট ৪৬ হাজার ৩৪৭টি সেচ পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎচালিত প্রায় ৬ হাজার সেচ পাম্প আর ৩৯ হাজারের বেশি ডিজেলচালিত সেচ পাম্প আছে। এবার ৫৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এ বোরো আবাদে ১০ হাজার ডিজেলচালিত সেচ পাম্প চলমান রয়েছে।
নাটোর জেলা পেট্রোল পাম্পমালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলার ৩২টি পেট্রোল পাম্প ও ২৫ জন এজেন্টকেও কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ডিজেল সঠিকভাবে পাচ্ছি না, ৯ হাজার লিটার চাইলে দেওয়া হচ্ছে তার অর্ধেক। যারা কৃষিকাজের জন্য তেল নিতে আসছে তাদের তেল দিতে পারছি না। কারণ যারা নিয়মিত যানবাহনে তেল নেয় তাদের দেওয়াই কঠিন হয়ে পরেছে। কৃষিকাজের জন্য ডিজেল বেশি দেওয়া দরকার বলে মনে করছেন তিনি।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, চলতি বছর জেলায় প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমিতে বোরো মৌসুমের ফসল আবাদ হয়েছে। ফসল উৎপাদন ব্যাহত না হয় সে বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। কোথাও বেশি দামে ডিজেল বিক্রি হলে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হচ্ছে। এ ছাড়া কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল এমরান ঝান জানান, ডিজেল বিক্রির দোকানগুলো নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশি দামে তেল বিক্রির অপরাধে একাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মোটা অঙ্কের অর্থ জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এফআর