যুদ্ধের শুরুটা ছিল কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রাদেশিক জনগণের ওপর জাতিগত নিধন। এই নিষ্ঠুরতা শুরু করে আইয়ুব খান; পঞ্চাশ দশকে বালুচদের নির্বিচার হত্যার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান একই পথ বেছে নেয় বাঙালিদের সবস্বান্ত করে পাকিস্তান ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।
মনে রাখা দরকার, সেনাবাহিনী পরিচালিত হয় কোনো না কোনো গোষ্ঠীস্বার্থে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রদেশে প্রদেশে গণহত্যার কী বা প্রয়োজন ছিল? কার স্বার্থ রক্ষার জন্য এই আগ্রাসন?
এর একটাই উত্তর পাঞ্জাবিদের কেন্দ্রে রেখে ভারত থেকে বিতাড়িত মুসলিম রিফুজি-গোষ্ঠীর পুনর্বাসনের জন্য এই নিধনযজ্ঞ প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের! জাতি পরিচয় এবং উদ্বাস্ত পরিচয়ের দ্বন্দ্ব মীমাংসার জন্য। স্বাধীন বাংলায় এখন যা নিষ্পত্তি হয়েছে ‘বাংলাদেশি’ নামে।
বাস্তবে পাকিস্তান নামে কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ব্রিটিশ-ভারতের মানচিত্রে ছিল না, এখনও নেই; যা আছে তা পাঞ্জাবি, পাঠান, বেলুচ, বাঙালি, সিন্দিসহ আরও কিছু জন-জাতির আবাসভূমি!
বাংলা থেকে এরা হিন্দুদের তাড়িয়ে আমাদের জাতিগত পরিচয় ভুলিয়ে দিয়ে সবাইকে উর্দুঅলা বানিয়ে পুরো পাকিস্তানে ভারতীয় মুসলিম রিফুজিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এ কারণে এই স্বার্থগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী দিয়ে বাংলার শহর-বন্দর, হাট-বাজার পুড়িয়ে দিতে থাকে এবং নির্বিচারে গণহত্যা চালায় পুরো ৯ মাস ধরে।
বাংলা বলতে তারা মনে করত হিন্দুদের আবাস! বাঙালিরা যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম, বাংলা যে পাকিস্তানেরই একটা প্রদেশ এই সত্যকে সৈনিকরা উপেক্ষা করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরের মতো শহর দখলে নিয়ে বাঙালি নিধনে নেমে পড়ে!
এদের সহায়তা দিতে এগিয়ে আসে শহরগুলোর বিহারি সম্প্রদায় এবং জামায়াত, নেজামে ইসলাম নামের ক্ষুদ্র কয়েকটি রাজনৈতিক দল; যারা যুদ্ধকালে রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামের সেমি-মিলিটারি বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি আগ্রাসনকে পথ দেখায়! মার্চ পেরিয়ে এই আগ্রাসন ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যন্ত গ্রামের ভেতর পর্যন্ত!
আমরা প্রাণভয়ে কর্ণফুলী পেপার মিলস এলাকা ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম বাবার কলিগ তৈয়ব তালুকদারের নিভৃত গ্রাম রাঙ্গুনিয়ার বাড়িতে। কিন্তু যুদ্ধ সেখানেও আমাদের পিছু নেয়। তার অপরাধ ছিল যুদ্ধভয়ে আমাদের মতো ত্রস্ত, সন্ত্রস্ত কয়েকটি পরিবারকে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিল। আমরা সেই বাড়িতে মার্চ-এপ্রিল মিলিয়ে মাসখানেক ছিলাম। এটা যে পাকিস্তানপন্থির বাড়ি, তা বোঝানোর জন্য তৈয়ব চাচা বাঁশের মাথায় চাঁদ-তারা পতাকা উড়িয়ে রেখেছিল; কাচারির সামনে বেঁধে রেখেছিল জোড়া বলদ।
কিন্তু যুদ্ধ কোনো আতিথ্য বোঝে না! কোনো এক জুমার দুপুরে পাঞ্জাবিরা কাপ্তাই রোড থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে গ্রামের দিকে ছুটে আসতে থাকে; যা ছিল ভয়ানক।
গ্রামের পথে ধুলো উড়িয়ে তিনটি সাঁজোয়া যান আকাশে গুলি ছুড়তে ছুড়তে তৈয়ব চাচার বাড়ির সামনে এসে থামে।
আর্মির গাড়ি আসতে দেখে গ্রামের মানুষ শুধু নয়, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, গাছের পাখ-পাখালি পর্যন্ত কোলাহলজুড়ে দিয়ে বাস্তুভিটা ছেড়ে পালাতে শুরু করে; যা ছিল আমার মতো পাঁচ-ছয় বছরের শিশুর জন্য অভূতপূর্ব দৃশ্য! পাকিস্তানিপন্থি কয়েকজন দালালের সহায়তায় সৈন্যরা পৌঁছে যায় তালুকদার বাড়ির সামনে।
বাবাকে দেখি ‘সবাই পালাও, সবাই পালাও’ চিৎকার করতে করতে বাড়ির ভেতরের দিকে ছুটে যায়। আমি আর ছায়া, দুই ভাই-বোন ঘরের কোনায় রাখা ধান-চালের মটকার আড়ালে লুকিয়ে পড়ি। তখন নিস্তব্ধ ভেতর-বাড়ি থেকে তৈয়ব চাচা, যিনি কিছুক্ষণ আগে জুমার নামাজ পড়ে বাড়িতে এসেছেন ঘরের দরজায় এসে উর্দুতে বললেন, আইয়ে সাহেব, হাম তৈয়ব তালুকদার হায়; আর তখনি উঠানে দণ্ডায়মান একজন পাকিস্তানি সৈনিক তার দিকে গুলি ছোড়ে!
পরপর তিনটা গুলির শব্দে মটকার আড়ালে লুকানো আমাদের কানে তালা লেগে যায়। তাকিয়ে দেখি তৈয়ব চাচা গুলির তোড়ে ঘরের মাটির দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে! মেঝে ও দেয়ালে তাজা রক্ত দেখে আমি আর ছায়া ভয়ে শক্ত হয়ে যাই; আর কানে আসে চাচার ভয়ংকর গোঙানির শব্দ! এ ছিল আমাদের জীবনের ভয়াবহ হত্যা দৃশ্য। আমরাও জ্ঞানহারা হয়ে যাই!
সৈনিকরা চলে যাওয়ার পর পুরো গ্রাম হামলে পড়ে তালুকদার বাড়িতে। তৈয়ব চাচার মা ‘আঁর পুত আঁর পুত’ বলে বুক চাপড়িয়ে বিলাপ করে। চাচি উঠানের ওপর গড়াগড়ি যায়। দুই শিশুপুত্র আমাদের সঙ্গে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রক্ত গড়িয়ে সিঁড়ি পর্যন্ত নেমে আসে। সবার সামনে দাপাতে দাপাতে মরে যায় তৈয়ব চাচা। এই মৃত্যু; এমন নিষ্ঠুরতা এক জীবনে ভোলার নয়।
কিন্তু সময় ছিল ভয়াবহ। চোখের জল চেপে রেখে সন্ধ্যা ঘনাতে না ঘনাতে সবাই মিলে এই মহৎপ্রাণ মানুষটিকে কবরে শুইয়ে দেয়। আব্বা এসে বলে তোমরা তৈরি হয়ে নাও। এখনই বেরোতে হবে। ঊত্তীর্ণ সন্ধ্যায় আমরা তালুকদার বাড়ি ছেড়ে গাঢ় অন্ধকার পথে কর্ণফুলীর তীরে এসে দাঁড়াই।
আলাউদ্দিন চাচা বলে, ‘দেরি করিয়েন না, ভাবি; নৌকায় ওঠেন।’
আমি জানতে চাই, ‘আব্বা কই?’
‘আছে। পরে আসবে।’
আমরা নদীর বুকে ভেসে চলি। কোথায় যাব,
জানি না।
এমন দুঃখের মধ্যেও তৈয়ব চাচি একটা বিছানার চাদর দিয়েছিলেন; আম্মা যা বহু বছর আলমারিতে রেখে মাঝেমধ্যে মিলাদের সময় ব্যবহার করেছেন।