দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি। শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে ছিনিয়ে এনেছিলেন লাল-সবুজের পতাকা। যুদ্ধ শেষে ফিরেছিলেন বিজয়ীর বেশে, ছিলেন এলাকার মানুষের গর্ব ও শ্রদ্ধার প্রতীক। অথচ সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার চিরনিদ্রার স্থান আজ অযত্ন, অবহেলা আর বিস্মৃতির ভারে নুয়ে পড়েছে।
আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে তার কবর, নেই কোনো পরিচর্যা কিংবা সংরক্ষণের ছোঁয়া। দেখে বোঝার উপায় নেই এখানেই শুয়ে আছেন এক সাহসী যোদ্ধা, যার আত্মত্যাগের বিনিময়ে এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে এক বীরের স্মৃতি, আর নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের এক মূল্যবান অধ্যায়। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার পাটোয়ার গ্রামের একমাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুন কমান্ডার রশিদ আহাম্মদ খন্দকার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বিত তালিকায় তার বেসামরিক গেজেট নম্বর ১৮৬২ এবং লাল মুক্তিবার্তা নাম্বার ০২০৪০৬০০৬৭। ১৯৫১ সালের ৫ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া এই বীর সন্তান ২০১৬ সালের ১৮ মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তার কবর আজ অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে। দেখে মনে হবে এই বীরের চিরনিদ্রার স্থানটি নীরবে অবহেলার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তিযোদ্ধার পরিবার ও এলাকাবাসী তার কবর সংরক্ষণ এবং যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রশিদ খন্দকার মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে পারিবারিক বাধা উপেক্ষা করে আগরতলা হয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে মেলাঘর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ২নং সেক্টরের অধীনে বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পার্শ্ববর্তী লাকসাম থানার প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ৯ মাস তিনি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে এলাকায় গড়ে তোলেন শক্ত প্রতিরোধ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তার সাহসিকতায় ভিত ছিল দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা। স্বাধীনতার পর তিনি নিভৃতে জীবনযাপন করলেও এলাকার মানুষের কাছে ছিলেন সম্মানিত একজন বীর। বীর মুক্তিযোদ্ধা রশিদ খন্দকারের ছোট ভাই হাসান আহম্মদ খন্দকার স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার ভাই ছিলেন খুব সাহসী ও দেশপ্রেমিক মানুষ। পরিবারের অনেক নিষেধ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশের টানে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধের সময় তার সাহসিকতার গল্প আমরা পরে অনেকের মুখে শুনেছি। এমন একজন বীরের কবর আজ অবহেলায় পড়ে থাকা সত্যিই কষ্টের।
আরও পড়ুন
সরেজমিন দেখা যায়, ওমরগঞ্জ বাজার থেকে আধা কিলোমিটারের কম দূরত্বে খন্দকার বাড়ি জামে মসজিদের পাশে এই প্লাটুন কমান্ডারের কবর। নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে কবরটি আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে। ঝোপঝাড়ের কারণে এটি যে কবর তা-ও বোঝার উপায় নেই। অবহেলায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। গরু-ছাগল অবাধে যাওয়ায় কবরটি আরও নষ্ট হচ্ছে।
পাটোয়ার গ্রামের বাসিন্দা আমির হামজা বলেন, আমরা যারা স্বাধীন দেশে বসবাস করছি, তাদের এই স্বাধীনতা এসেছে এইসব বীরদের ত্যাগের বিনিময়ে। তাই তাদের প্রতি সম্মান দেখানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত আছি, তবে সরকারি সহায়তাও প্রয়োজন।
মরহুম রশিদ খন্দকারের পাঁচ মেয়ে, সবাই এখন উচ্চ শিক্ষিত। বীর মুক্তিযোদ্ধার কন্যা শিক্ষিকা সাজিয়া সুলতানা শশী খন্দকার আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, বাবা আমাদের গর্ব। ওনার মুখে যুদ্ধের গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছি। তিনি দেশকে ভালোবেসে সবকিছু ত্যাগ করেছেন। কিন্তু আজ বাবার কবরের এই অবস্থা দেখে আমাদের খুব পীড়া দেয়। তিনি আরও জানান, বাবার স্মৃতিকে ধরে রাখতে একটি সড়ক তার নামে নামকরণের জন্য বহুবার চেষ্টা করেও সফল হননি তারা।
জানতে চাইলে নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিজা আক্তার বীথি সময়ের আলোকে বলেন, আমি মুক্তিযোদ্ধার এই বিষয়টি জানি না। এখন আপনার মাধ্যমে জেনেছি, তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কারোর সঙ্গে আমার কথা হয়নি। যেহেতু আমি জেনেছি এখন করণীয় কিছু থাকলে অবশ্যই করব।
এএডি/