প্রায় এক মাস ধরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড না থাকায় কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় ভূমি প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক জটিলতা। জমির মালিকানা ও রেকর্ড হালনাগাদ, নামজারি-খারিজ, ভূমি উন্নয়ন কর, খাসজমি ব্যবস্থাপনা, সরকারি জমি রক্ষা, জমি নিয়ে বিরোধের শুনানি ও নিষ্পত্তিসহ ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে এসিল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকায় পদটি দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাপ্রত্যাশীরা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ভূমি অফিসের নিয়মিত কার্যক্রমের কিছু অংশ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরিচালনা করলেও এসিল্যান্ডের সিদ্ধান্ত, শুনানি বা অনুমোদন প্রয়োজন এমন বিষয়গুলোতে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রকার জট তৈরি হয়েছে।
ভূমি ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ নামজারি। জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার কিংবা অন্য কোনো বৈধভাবে মালিকানা পরিবর্তনের পর রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে নামজারি করতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় আবেদন যাচাই, মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন, আপত্তি থাকলে শুনানি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মতো একাধিক ধাপ রয়েছে। নামজারি দীর্ঘায়িত হলে জমির রেকর্ড হালনাগাদে সমস্যা হয়। পরবর্তী সময়ে জমি বিক্রি, ব্যাংকঋণ, বন্ধক কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে এর প্রভাব পড়তে পারে।
জমির মালিকানা, দখল, সীমানা কিংবা খতিয়ান নিয়ে বিরোধও ভূমি কার্যালয়ে নিয়মিত আসে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় শুনানি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা না থাকায় এ ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হচ্ছে। ছোট একটি ভূমিবিরোধ সময়মতো নিষ্পত্তি না হলে তা দীর্ঘদিন চলতে পারে এবং একপর্যায়ে আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সময়, অর্থ ও শ্রম— তিনটিই নষ্ট হবে।
খাসজমি ও সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনাও ভূমি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সরকারি জমি চিহ্নিত করা, রেকর্ড সংরক্ষণ, অবৈধ দখল প্রতিরোধ, দখলমুক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের ভূমি প্রশাসন সরাসরি যুক্ত। দীর্ঘ সময় দায়িত্বশীল কর্মকর্তা না থাকলে এসব বিষয়ে নিয়মিত তদারকি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় ও জমির রেকর্ডের বিভিন্ন জটিলতার সঙ্গেও এসিল্যান্ডের কার্যালয়ের কার্যক্রম যুক্ত। জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধে রেকর্ডগত সমস্যা দেখা দিলে অনেক ক্ষেত্রে তা নিষ্পত্তির জন্য ভূমি অফিসের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। ফলে কর্মকর্তা সংকটের প্রভাব শুধু সেবাপ্রত্যাশীদের ওপর নয়, সরকারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।
টেকনাফের মতো সীমান্তবর্তী ও দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি উপজেলায় ভূমি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বেশি। জমির মালিকানা, দখল, সরকারি সম্পত্তি, খাসজমি ও রেকর্ডের বিষয়গুলোতে প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল হওয়ার সুযোগ নেই। তাই দীর্ঘ সময় এসিল্যান্ড পদ শূন্য থাকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ভূমিসেবা সরাসরি মানুষের সম্পদ ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয় হওয়ায় এ পদ দীর্ঘদিন শূন্য রাখা উচিত নয়। দ্রুত একজন নিয়মিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদায়নের পাশাপাশি ইতোমধ্যে জমে থাকা আবেদন, শুনানি ও অন্যান্য ভূমিসংক্রান্ত কাজ দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে ভূমি প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সরকারি রাজস্ব আদায়েও গতি ফিরবে।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ভূমি সেবা কার্যক্রম আরো ত্বরান্বিত করতে শূন্য পদের বিষয়টি বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়কে জানানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, অতি শীঘ্রই নতুন একজন এসিল্যান্ড পদায়ন করা হবে।
সময়ের আলো/আতা