বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূ-প্রকৃতিতে লুকানো সম্ভাবনার কথা সারা দেশে অনেকেই জানে না। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদীর বালুচর, যা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের ঘর-বাড়ি নির্মাণে বালু সরবরাহের জন্য পরিচিত ছিল, এখন দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
সম্প্রতি গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র চরে পাওয়া গেছে রুটাইল, জিরকন, ম্যাগনেটাইটসহ একাধিক মূল্যবান ভারী খনিজ, যা শিল্পায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গাইবান্ধার খারজানি চরে অস্ট্রেলিয়ান প্রতিষ্ঠান এভারলাস্ট মিনারেলস কোম্পানি লিমিটেড পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন করে বালু থেকে খনিজ আলাদা করার কাজ শুরু করেছে।
প্রতিষ্ঠানের প্রথম বছরের আহরণের ফলাফল অনুসারে, শুরুতে মাত্র ১ শতাংশ ভারী খনিজ পাওয়া যাচ্ছিল; বর্তমানে তা গড়ে ৩.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কোম্পানিটির লক্ষ্য দ্রুত এটি ৮ শতাংশে নিয়ে আসা এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা।
জয়পুরহাটের ইনস্টিটিউট অব মাইনিং, মিনারেলজি অ্যান্ড মেটালার্জি-এর পরিচালক ড. আমিনুর রহমান জানান, ব্রহ্মপুত্রের বালুচরে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি খনিজ দেশের শিল্প খাতের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই খনিজগুলো প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিল্প উৎপাদনকে শক্তিশালী করতে সক্ষম।
জিরকন প্রধানত সিরামিক টাইলস ও রিফ্যাক্টরিজ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। এর কঠিনতা ও তাপ-সহনশীলতা সিরামিক শিল্পে উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য।
রুটাইল খনিজ রং, প্লাস্টিক, কসমেটিকস এবং ওষুধ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ। এর টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইড উপাদানটি রঙিন পণ্য ও শিল্পজাত প্লাস্টিককে উচ্চমানের ফিনিশ প্রদান করে।
ইলমেনাইট মূলত ওয়েল্ডিং রড এবং টাইটানিয়াম শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এটি তাপ এবং চাপের প্রতি সহনশীল হওয়ায় ধাতু ও সংযোজন শিল্পে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ম্যাগনেটাইট ইস্পাত এবং চুম্বক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইস্পাত শিল্পে এর ব্যবহার উচ্চ-মানের শক্তিশালী ধাতু উৎপাদনে সহায়ক।
শেষে, গার্নেট খনিজ সিরিঞ্জ এবং কাগজ শিল্পে ব্যবহারযোগ্য। এর কঠোরতা এবং ক্ষয়-প্রতিরোধ ক্ষমতা শিল্পজাত পণ্যের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।
ড. আমিনুর রহমানের মতে, এই পাঁচটি খনিজের সঠিকভাবে আহরণ এবং ব্যবহার দেশের শিল্প খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে, যা বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, প্রতিটি বর্গকিলোমিটার বালুচরের ১০ মিটার গভীরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন ভারী খনিজ পাওয়া সম্ভব। বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৪ কোটি টাকা।
গাইবান্ধা সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মমিনুল ইসলাম আকন্দ বলেন, এ ধরনের খনিজ এখন বিদেশ থেকে চড়া দামে আমদানি করতে হয়। দেশে উৎপাদন শুরু হলে সিরামিকসহ বিভিন্ন রফতানিমুখী শিল্পে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
২০২৪ সালে সরকার ২৮টি শর্তে এভারলাস্ট মিনারেলসকে ৭৯৯ হেক্টর বালুচর ইজারা দিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী আহরিত খনিজের ৪৩ শতাংশ পাবে সরকার, বাকি ৫৭ শতাংশ পাবে কোম্পানি।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান প্রফেসর আব্দুল হাই বলেন, বাণিজ্যিকভাবে এই খনিজ আহরণ শুরু হলে দেশের শিল্পখাত ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। ব্রহ্মপুত্রের চরে লুকিয়ে থাকা এই সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে তা শিল্পায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।
ব্রহ্মপুত্র নদের বালুচর এখন শুধুমাত্র নির্মাণ সামগ্রীর উৎস নয়, এটি বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের সম্ভাবনার নতুন কেন্দ্রবিন্দু। সঠিক পরিকল্পনা ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই খনিজ সম্পদ দেশের অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিতে পারে।