ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট “ইউনিট ৫০৪”-এ নারীদের অন্তর্ভুক্তি একটি ঐতিহাসিক ও কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতদিন এই ইউনিটের কমব্যাট ও ফিল্ড অপারেশন পুরোপুরি পুরুষনির্ভর ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নিরাপত্তা বাস্তবতা, বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর, ইসরায়েল বুঝতে পারে যে তাদের গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। সেখান থেকেই আসে প্রশ্ন, “নারী কেন নয়?”, আর সেই প্রশ্নের উত্তরেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়।
প্রথম নারী কমান্ডারের নেতৃত্বে অভিযান
লেফটেন্যান্ট আর (ছদ্মনাম) ইউনিট ৫০৪-এর ইতিহাসে প্রথম নারী টিম কমান্ডার। তার নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গোপন মিশন ছিল এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রমাণ। একটি বিশেষ টিম, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয় সদস্য ছিলেন, সীমান্ত অতিক্রম করে শত্রু ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় কিছু মানুষের সঙ্গে প্রথমবারের মতো যোগাযোগ স্থাপন করা এবং তাদের ইসরায়েলের জন্য তথ্যদাতা হিসেবে নিয়োগ করা।
মিশনে লেফটেন্যান্ট আর-এর সঙ্গে ছিলেন একজন নারী সার্জেন্ট, একজন কেইস অফিসার এবং কয়েকজন কমব্যাট সদস্য। যাত্রার শুরু থেকেই পুরো দলকে মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয়। গাড়ির ভেতরে বসেই তারা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নেন—অস্ত্র পরীক্ষা, ম্যাগাজিন ঠিক আছে কিনা দেখা, বুলেটপ্রুফ (সিরামিক) ভেস্ট শক্ত করে পরা, মুখে মাস্ক লাগানো এবং জরুরি পরিস্থিতির পরিকল্পনা (‘কেস অ্যান্ড রেসপন্স’) পুনরাবৃত্তি করা।
অজানা ভূখণ্ডে উত্তেজনাপূর্ণ অগ্রযাত্রা
দলটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অপরিচিত ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। নেভিগেশন ছিল জটিল এবং প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা ও চাপ বাড়তে থাকে। লেফটেন্যান্ট আর নিজের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে রেখে পুরো টিমকে ফোকাসড থাকতে নির্দেশ দেন।
গাড়ি থেকে নেমে তারা দ্রুত ও নিঃশব্দে এগিয়ে যান। হাতে অস্ত্র, চোখে নাইট ভিশন গগলস—অন্ধকারে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে তারা ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছান। প্রথমে এলাকাটি নিরাপদ কিনা তা নিশ্চিত করা হয়, তারপর শুরু হয় মূল যোগাযোগ প্রক্রিয়া।
নারী সদস্যদের বিশেষ ভূমিকা
এই ধরনের মিশনে নারী সদস্যদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। যখন লক্ষ্যবস্তু দলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়, তখন নারী সদস্যরা বিশেষভাবে নারী অংশগ্রহণকারীদের আলাদা করে নিয়ে যান। তাদের সঙ্গে আলাপচারিতা করা, আস্থা তৈরি করা এবং নিরাপত্তার জন্য দেহ তল্লাশি করা—এই দায়িত্বগুলো নারীরাই পালন করেন।
এই তল্লাশির উদ্দেশ্য ছিল নিশ্চিত হওয়া যে কেউ কোনো গোপন অস্ত্র বহন করছে না, যা পুরো টিমের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। আগে থেকেই গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিদের প্রস্তুত রাখা হয়েছিল, তাই তারা এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে।
এরপর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে কেইস অফিসার সম্ভাব্য এজেন্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে তাদের ইসরায়েলের জন্য কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে কী সুবিধা পাবে তা আলোচনা করা হয়, যেমন অর্থ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, উন্নত চিকিৎসা বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ।
মিশন শেষে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন
বৈঠক শেষ হলে দলটি নিশ্চিত করে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছে। এরপর আবার ঝুঁকিপূর্ণ পথ ধরে সীমান্তের দিকে ফিরে যাওয়া শুরু হয়। এই সময়ও বিপদের সম্ভাবনা থাকে, হঠাৎ চেকপয়েন্ট, শত্রু বাহিনীর নজরদারি বা তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি সবসময় থাকে। কয়েক ঘণ্টার টানটান উত্তেজনার পর তারা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে আসে।
বাইরে থেকে দেখলে এটি হয়তো একটি সাধারণ গোপন অভিযান মনে হতে পারে, কিন্তু এই মিশন নারী সদস্যদের জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা প্রমাণ করেছে যে তারা এই ধরনের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কাজেও সমানভাবে সক্ষম।
ইউনিট ৫০৪-এর কাজের ধরন
ইউনিট ৫০৪ মূলত ‘হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স’ সংগ্রহে বিশেষজ্ঞ। তাদের কাজ হলো মানুষের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা—যা দুইভাবে করা হয় :
বন্দিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তাৎক্ষণিক তথ্য বের করা
স্থানীয় ব্যক্তিদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করা
প্রতিটি এজেন্টের জন্য একজন ‘কেইস অফিসার’ থাকে, যিনি তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এই অফিসারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ কমব্যাট টিম থাকে, যেখানে এখন নারীরাও অন্তর্ভুক্ত।
কেন নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হলো?
ইউনিটের কর্মকর্তাদের মতে, নারীদের অন্তর্ভুক্তির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, নারীরা অনেক সময় সহজে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন, ফলে তাদের প্রতি সন্দেহ কম হয়।
দ্বিতীয়ত, নারী-সম্পৃক্ত সমাজে নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে নারী সদস্যরা বেশি কার্যকর।
তৃতীয়ত, এটি অপারেশনাল নমনীয়তা বাড়ায়, যা জটিল মিশনে বড় সুবিধা দেয়।
৯ মাসের অগ্নিপরীক্ষা
এই ইউনিটে যোগ দেওয়া সহজ নয়। নির্বাচনের পর প্রার্থীদের প্রায় ৯ মাসের কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত থাকে, আরবি ভাষা ও স্থানীয় উপভাষা শেখা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও আচরণ অনুকরণ করা, দীর্ঘ ও স্বল্প পাল্লার অস্ত্র চালনা, ক্লোজ-কোয়ার্টার কমব্যাট (হাতাহাতি যুদ্ধ) এবং গোপন সংকেত ও নীরব যোগাযোগ পদ্ধতি।
এছাড়া তাদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখতে একে অপরকে নাম ধরে ডাকাও নিষিদ্ধ থাকে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বাস্তবসম্মত মিশনের অনুশীলন করা হয়।
এই দলে থাকা নারীরা বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক বাধা অতিক্রম করে এখানে পৌঁছেছেন। যেমন—আনাত (২২) নিজেকে ‘নরম স্বভাবের’ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রমাণ করেছেন যে মানসিক দৃঢ়তা শারীরিক চেহারার ওপর নির্ভর করে না। অরলি (২১), যিনি একটি রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছেন, মানসিক শক্তি অর্জনের জন্য ট্রায়াথলন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। আর মায়া (২০), যিনি প্রশিক্ষণের সময় আহত হয়েও হাল ছাড়েননি, দেশের জন্য কাজ করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে গেছেন।
এই নারী যোদ্ধাদের অনেকেই এমন পরিবার থেকে এসেছেন যেখানে নারীদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া সহজভাবে দেখা হয় না। তবুও তারা নিজেদের বিশ্বাস ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে এই পথ বেছে নিয়েছেন।
দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও একসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে অংশ নেওয়ার ফলে তারা একে অপরের প্রতি গভীর আস্থা তৈরি করেছেন। তারা এখন শুধু সহকর্মী নয়—বরং “সিস্টার্স ইন আর্মস”, অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রের একে অপরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।
ইউনিট ৫০৪-এ নারীদের অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি সাংগঠনিক পরিবর্তন নয়, বরং আধুনিক গোয়েন্দা কৌশলের একটি বড় অগ্রগতি। এটি প্রমাণ করে যে দক্ষতা, সাহস ও মানসিক দৃঢ়তার ক্ষেত্রে লিঙ্গ কোনো বাধা নয়। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসরায়েল তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, নমনীয় ও বাস্তবসম্মত করে তুলেছে।
/ইউএমএইচ