দূষণের মৃত্যুফাঁদে বন্দি শৈশব

শফিকুল ইসলাম, শরীয়তপুর

সারাদেশ

অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের দাবিতে দায়ের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনায় বলা হয়, সারা দেশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ

2026-04-01T04:30:59+00:00
2026-04-01T04:30:59+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
দূষণের মৃত্যুফাঁদে বন্দি শৈশব
শফিকুল ইসলাম, শরীয়তপুর
প্রকাশ: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৩০ এএম 
সংগৃহীত ছবি
অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের দাবিতে দায়ের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনায় বলা হয়, সারা দেশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও উচ্ছেদ করতে হবে। ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দেওয়া ওই রায়ে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ইটভাটা পরিচালনা নিষিদ্ধ করা হয়। 

এ ছাড়া কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে ভাটা স্থাপন বন্ধ এবং শিশু শ্রম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতরকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ উল্টো। 

আদালত রায় প্রদানের পর এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কার্যত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই রায় বাস্তবায়নে। বিশেষ করে নানা বয়সি শিশুদের অবাধে কাজ করানো হচ্ছে ইটভাটায়। বিনিময়ে সামান্য পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে তাদের। ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া আর ধুলায় বাড়ছে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি। তারপরও পেটের তাগিদে ইটভাটার মৃত্যুফাঁদে আটকে আছে অসহায় এই শিশুরা।     

এ প্রসঙ্গে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং যেগুলোর লাইসেন্স নবায়নযোগ্য নয় সেগুলো ধ্বংসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

ইটভাটায় শিশুশ্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় শিশুশ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানোর বিষয়টি সামনে আসে না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শরীয়তপুর জেলা পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. রাসেল নোমান বলেন, চলতি মৌসুমে শরীয়তপুরে ৪টি ছাড়া বাকি সব ভাটাই অবৈধ। ইতিমধ্যে ৮টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রায় ৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। 

শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে বলেও জানান শরীয়তপুর জেলা পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. রাসেল নোমান। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শরীয়তপুর জেলার ৬টি উপজেলায় বর্তমানে ৩৫টি ইটভাটা চালু রয়েছে। এসব ইটভাটার মধ্যে মাত্র ৪টির পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে। বাকি প্রায় সবগুলোই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। উচ্ছেদ করা হয়েছে মাত্র ৩-৪টি ভাটা, যা পুরো পরিস্থিতির তুলনায় নগণ্য।

শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শরীয়তপুর সদর উপজেলায় ১৩টি, জাজিরায় ৫টি, নড়িয়ায় ৬টি, গোসাইরহাটে ৬টি, ভেদরগঞ্জে ৩টি এবং ডামুড্যায় ২টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটার অধিকাংশই প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও পরিবেশ ছাড়পত্র থাকলেও অন্যান্য লাইসেন্স নেই, আবার কোথাও নবায়নই করা হয়নি।

সরেজমিন দেখা যায়, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে দিন-রাত সমানতালে ইট পোড়ানো চলছে। অধিকাংশ ভাটা গড়ে উঠেছে ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে। এতে একদিকে মারাত্মক বায়ুদূষণ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা আদালতের রায়ের সরাসরি লঙ্ঘন। ইটভাটাগুলোয় সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় শিশুশ্রমের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন ভাটায় ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সি শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। 

শরীয়তপুর সদরের চর ডোমসার এলাকায় মেঘনা ব্রিকসে গিয়ে দেখা যায়, ১০ বছর বয়সি আরাফাত মাটি সরবরাহের কাজ করছে। মাত্র ৬ মাসের জন্য ৪০ হাজার টাকায় তাকে কাজে আনা হয়েছে। 

একই ভাটার ১৬ বছর বয়সি নুর আলম জানায়, তাকে পারিশ্রমিক হিসেবে ৬ মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়েছে। অন্যদিকে কোয়ারপুর এলাকার যমুনা ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে ৮ বছর বয়সি ইয়াসিন মাসে ৮ হাজার টাকায় ইট শুকানো ও বহনের কাজ করছে। 

তথ্য বলছে, শরীয়তপুরে জেলার বিভিন্ন ইটভাটায় দেড় শতাধিক শিশু সরাসরি শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। পরিবারের সঙ্গে আসা শিশুদের ধরলে এই সংখ্যা ৫ শতাধিক ছাড়িয়ে যেতে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, তথ্য সংগ্রহে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই ইটভাটার মালিকরা সাংবাদিকদের সহযোগিতা করতে চান না। এমনকি সাংবাদিকদের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণও করতে দেখা গেছে ইটভাটার মালিকদের। 

এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে শরীয়তপুর জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি জলিল খান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। 

তার কথায়, সমস্যা গোড়াতেই। এখন যেভাবে পারেন কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন শরীয়তপুর জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি জলিল খান।

এদিকে প্রশাসনের অভিযানে কার্যকর কোনো পরিবর্তন আসছে না বলেই মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জরিমানা আরোপ করে দায় সারছে প্রশাসন। অভিযান চলাকালীন জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন ভাটার মালিকরা। 

অভিযান শেষে কিছু দিন বন্ধ থাকলেও পরে পুনরায় চালু করা হচ্ছে ইটভাটার অবৈধ কার্যক্রম। 

আর পরিবেশবিদরা বলছেন, হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়নে গাফিলতি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। জরিমানার বদলে স্থায়ীভাবে ইটভাটা বন্ধ ও ধ্বংস না করলে পরিবেশ দূষণ, কৃষিজমির ক্ষতি এবং শিশুশ্রম কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব নয়। দ্রুত সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।



  বিষয়:   ইটভাটা  শরীয়তপুর  পরিবেশ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: