যুদ্ধের আঘাতে ভাঙছে রক্তের সম্পর্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানে চলমান যুদ্ধের ক্ষত ধীরে ধীরে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক ও আবেগের গভীরে প্রবেশ করেছে। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও মতাদর্শগত

2026-04-02T03:39:26+00:00
2026-04-02T03:39:26+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যুদ্ধের আঘাতে ভাঙছে রক্তের সম্পর্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৩৯ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ইরানে চলমান যুদ্ধের ক্ষত ধীরে ধীরে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক ও আবেগের গভীরে প্রবেশ করেছে। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও মতাদর্শগত বিভাজন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রক্তের সম্পর্ক পর্যন্ত ভেঙে যাচ্ছে। কেউ যুদ্ধকে পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখছে, আবার কেউ এটিকে নিরীহ মানুষের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে দেখছে। বোমা আর ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দের মধ্যেই ইরানের ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে নীরব কিন্তু গভীর এক দ্বন্দ্ব, যা ভবিষ্যৎ সমাজকেও দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।

তেহরানের কাছের একটি শহরে এক ভাই তার বোনকে বলেছে, ‘তুমি আর আমার বোন নও।’ উত্তরে বোনের তীব্র প্রতিক্রিয়া। এই ছোট্ট ঘটনাই তুলে ধরে ইরানের বর্তমান বাস্তবতা- যেখানে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়, পরিবারগুলোর ভেতরেও চলছে।

সিনার পরিবারে এমনই এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। নওরোজ উপলক্ষে সবাই দাদির বাড়িতে জড়ো হলেও আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। তার চাচা, যিনি সরকারের সমর্থক একটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর সদস্য, নিজের বোনের সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা, তাকে অভিবাদন জানাতেও অস্বীকার করেন। মতভেদের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একই ঘরে থেকেও তারা যেন সম্পূর্ণ আলাদা জগতে বসবাস করছেন।

সিনা নিজে সরকারবিরোধী এবং মনে করেন, বাইরের হামলা হয়তো পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু তার চাচার অবস্থান একেবারেই বিপরীত। অতীতে বিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকা নেওয়া এই চাচা এমনকি একসময় বলেছিলেন, তার নিজের সন্তান মারা গেলেও তিনি তাদের মরদেহ নিতে যাবেন না। অথচ এখন যুদ্ধের ভয়ে তাকে কিছুটা নরম ও দ্বিধাগ্রস্ত মনে হচ্ছে।

তেহরানের আরেক তরুণ কাবেহর গল্পও ভিন্ন নয়। তার বোনও সরকারের সমর্থক। পারিবারিক সম্পর্ক আগে থেকেই টানাপড়েনে থাকলেও যুদ্ধ সেই দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নওরোজ উদযাপন করতে পরিবারের সঙ্গে গেলেও শেষ পর্যন্ত তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে তিনি একাই ফিরে আসেন। তার কথায়, ‘আমি আর সহ্য করতে পারি না।’

ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিছু মানুষ বিকল্প উপায়ে যোগাযোগ রাখছে। তবে এই যোগাযোগই অনেক সময় নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। কাবেহ তার বন্ধু ও পরিবারের জন্য বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে ইন্টারনেট সরবরাহ করতেন, যা তার বোন বন্ধ করে দেন। এই ঘটনাও তাদের মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি করে।

উত্তর ইরানের এক ছাত্রী মারালের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। তার বাবা যুদ্ধকে সমর্থন করেন এবং মনে করেন, এতে দেশ বদলে যাবে। কিন্তু মারাল এই আশাবাদে বিরক্ত। তার মতে, ‘সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে।’ বাবার সঙ্গে তার তর্ক প্রায়ই চরমে পৌঁছে যায়, বিশেষ করে যখন তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ দেখান।

তেহরানের তরুণী তারা শুরুতে পরিবারের কাছ থেকে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, কারণ তিনি যুদ্ধের বিরোধিতা করেন। তার মা ও বোন মনে করতেন, তিনি বাস্তবতা বোঝেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোমা হামলা কাছাকাছি পৌঁছানোর পর তাদের অবস্থান কিছুটা বদলাতে শুরু করেছে।

নওরোজের মতো উৎসব, যা সাধারণত আনন্দ ও মিলনের প্রতীক, সেটিও এবার হয়ে উঠেছে অস্বস্তির উপলক্ষ। একই টেবিলে বসেও অনেকে কথা বলেন না, চোখাচোখি এড়িয়ে যান। কোথাও কোথাও আবার পুরোনো ক্ষোভ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পরিবারগুলোতে তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য দেয়াল, যা হয়তো আর সহজে ভাঙবে না।

অনেক তরুণ-তরুণী জানিয়েছেন, তারা এখন নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পান। ভুল মানুষের সামনে কিছু বলে ফেললে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে এমন আশঙ্কা সবসময় কাজ করে। ফলে বন্ধুত্বের সম্পর্কও আগের মতো খোলামেলা নেই। অনেকেই ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন।

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে অনেক জায়গায় কাজের সুযোগ কমে গেছে, পণ্যের দাম বেড়েছে, আর অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই চাপ পারিবারিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   যুদ্ধ  আঘাত  রক্ত  সম্পর্ক 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: