অভাব-অনটনের সংসারে খেয়ে না খেয়ে দিন চলত। বাবার উপার্জনের একমাত্র পথ ছিল প্যাডেল ভ্যান। আর্থিক সংকটের কারণে নিজের পড়ালেখার খরচ চালাতে বছরের পর বছর ছেলে ফরমাজুল ইসলামকেও ভ্যান চালাতে হয়েছে। পাঁচবার বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভালো করতে না পারলেও তিনি দমে যাননি। দুয়ারে দুয়ারে চাকরির জন্যও ঘোরেননি।
বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে হাঁস পালনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে আত্মনির্ভরশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ফরমাজুল ইসলাম। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় এখন সবার কাছে পরিচিত ফরমান হাঁসের খামার। আজ ভ্যানচালক থেকে সফল খামারের মালিক তিনি। ৯শ থেকে এক বছরের মাথায় ৯ হাজার হাঁসের মালিক হয়েছেন তিনি। অল্প পুঁজিতে এই ব্যবসায় সফল হয়েছেন তিনি। তার খামারে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। দিন দিন এলাকাবাসী হাঁস পালনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাটোরের হালতিবিল ও চলনবিল এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫০টি হাঁসের খামার রয়েছে। এসব খামারে পাঁচ লাখের বেশি হাঁস পালন করা হচ্ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে অনেক বেকারের। সরেজমিন দেখা যায়, নলডাঙ্গায় উজান থেকে নেমে আসা বারনই, গদাই এবং আত্রাই নদীতে হাঁসের মিছিল। এই অঞ্চলে বিভিন্ন খামারে দুই ধরনের হাঁস পালন করা হয়। ডিম দেয় এমন একটি জাত, আরেকটি হলো মাংসের জন্য। এসব ডিম ও হাঁস স্থানীয়ভাবে চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকায় বিক্রি করা হয়।
নলডাঙ্গা উপজেলার পূর্ব সোনাপাতিল গ্রামের ফরমাজুল ইসলামের খামারে এখন ৯ হাজারের বেশি হাঁস রয়েছে। আলাপকালে এই উদ্যোক্তা বলেন, ব্যবসায়িক চিন্তাভাবনা ছোটবেলা থেকেই ছিল। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পরে বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশন নিতে থাকি। পাঁচবার বিসিএস পরীক্ষায় অ্যাটেন্ড করার পরেও ভালো করতে না পারায় ব্যবসার পরিকল্পনা করি। মাথায় বুদ্ধি এলো হাঁসের খামার করার।
নিজের দুই লাখ টাকা দিয়ে এবং ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ৯শ বড় হাঁস দিয়ে খামার শুরু করি। পরে ফেসবুকের মাধ্যমে এই খামারের প্রচার চালাই। পরিচিত কয়েকজন শেয়ারে বিজনেস করার আগ্রহ দেখান। প্রথম বছরেই প্রায় ১৫ লাখ টাকা সংগ্রহ হয়। চলতি বছর আরও প্রায় ২০ লাখ টাকা যুক্ত হয়েছে। এখন আমার ফার্মের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সর্বমোট ৩৫ লাখ টাকা। প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ডিম উৎপাদন হচ্ছে খামারে। এ ছাড়া এই খামার থেকে বাচ্চাসহ সব ধরনের হাঁস সরবারাহ করা হয়। এর বাইরে হ্যাচারিতে বাচ্চা ফুটানো হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, এই অঞ্চলে ২৫০টিরও বেশি হাঁসের খামার আছে। হাঁস পালন করে অনেকেই লাভবান হয়েছেন। জেলার নলডাঙ্গা, সিংড়া এবং গুরুদাসপুর এলাকায় সারা বছর নদী ও জলাশয় কম-বেশি পানি থাকায় প্রাকৃতিক খাবারের যথেষ্ট জোগান রয়েছে।
স্থানীয় আড়তদাররা বলছেন, ডিমের আড়ত না থাকায় স্থানীয়দের বেশি দামে ডিম কিনতে হয়। নলডাঙ্গায় ডিমের আড়ত থাকলে সবার জন্যই ভালো হতো।
সময়ের আলো/আআ