দেশে জ্বালানি সংকটে সবসময় আলোচনায় ছিল ডিজেল। দেশে আমদানি হওয়া জ্বালানির বড় অংশই ডিজেল। আবার তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) বেশি পরিশোধন করা হয় ডিজেল। বেসরকারি তেল শোধনাগারগুলোতেও বেশি উৎপাদন হয় ডিজেল। ডিজেলের মজুদ কমলেই রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির দৌড়ঝাঁপ বেড়ে যায়। কোম্পানির পক্ষ থেকে যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে।
জানতে চাওয়া হয় ডিজেলের আমদানি চালান চট্টগ্রাম বন্দরে কবে পৌঁছাবে। কিন্তু ইরানে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরুর পর চাহিদা বাড়ে অকটেনের। পেট্রোল পাম্পে বেড়ে গেছে অকটেনের ব্যাপক চাহিদা। পাম্পে দীর্ঘ সারিতে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়ানো সবারই চাহিদা অকটেনের। হঠাৎ বেড়ে গেছে অকটেনের চাহিদা। সেই সঙ্গে বেড়েছে পাম্পের সামনে দীর্ঘ সারিও।
বিপিসি ও তেল কোম্পানির কর্মকর্তারা মনে করছেন চার কারণে হঠাৎ বেড়েছে অকেটের চাহিদা। এর মধ্যে আছে সরবরাহ ঘাটতির আতঙ্ক থেকে বেশি কেনা, প্যাক পয়েন্ট ডিলারদের বেশি অকটেন মজুদ করা, বেশি দামে বিক্রি করতে স্থানীয়ভাবে যত্রতত্র মজুদ করা, চাহিদা না থাকলেও যানবাহনের পুরো ট্যাঙ্ক ভর্তি করে নেওয়ার জোর চেষ্টা।
বিপিসি সূত্র জানায়, দেশে এক মাসে ডিজেলের যা চাহিদা এক বছরেও তা নেই অকটেনের। সারা দেশের ডিপোগুলো থেকে এক দিনে উত্তোলন হয় ১২ হাজার মেট্রিকটনের বেশি ডিজেল। আর এক দিনে অকটেন উত্তোলন হয় এক হাজার টন থেকে ১১০০ টন। এক দিনে উত্তোলন করা ডিজেলের সমপরিমাণ অকটেন দিয়ে প্রায় ১৩ দিনের চাহিদা পূরণ হয়। বছরের বিভিন্ন সময় জ¦ালানি তেলের সংকটের বিষয় আলোচনায় আসে। সবসময় ডিজেলের সংকট নিয়েই যতসব আলোচনা। গত এক যুগেও অকটেন সংকট কোনো সময় আলোচনায় ছিল না। অথচ ইরান য্দ্ধু শুরুর পর এখন অকটন নিয়েই দেশজুড়ে সরব আলোচনা চলছে।
তেল কোম্পানির যমুনার উপ-মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) হাসান ইমাম সময়ের আলোকে বলেন, আমরা পেট্রোল পাম্পে কিছু দিন আগেও বলতাম ৫০ হাজার লিটার অকটেন দেওয়া হয়েছে। এতদিনেও কেন বিক্রি হলো না। আর এখন পেট্রোল পাম্প মালিকরা কয়েকগুণ বেশি অকটেন ডিমান্ড করছেন। কেন বেশি অকটেন লাগছে, কোথায় বিক্রি হচ্ছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না। পাম্প মালিকরা আমাদের কাছে বেশি অকটেন চায়। আমরা গত এক বছর যেভাবে দিয়েছিলাম এখনও সেভাবে দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের দেওয়া অকেটেন তাদের চাহিদা মেটে না যেন। হঠাৎ অকটেন চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে আমরা মনে করছি অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। বরাবরের মতো আমরাও সন্দেহ করছি অকটেন স্টক বা মজুদ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সারা দেশে হাজার হাজার প্যাক পয়েন্ট ডিলার আছেন। তেল কোম্পানির অনুমোদিত এসব প্যাক পয়েন্ট ডিলাররা ড্রাম, বোতল কিংবা কোনো জারে মজুদ করতে পারেন। তারা চাইলে অকটেন মজুদ করতে পারেন। কারণ এসব ডিলারদের তদারকির সুযোগ নেই। বেশিরভাগের অবস্থান দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। তাই মনে করছি প্যাক পয়েন্টে ডিলাররা মজুদ করছেন। সংকট বেড়ে যেতে পারে এ জন্য কিছু বাইকার বেশি করে অকটেন নিচ্ছেন। আগে বাইক বা গাড়ির মালিক ট্যাঙ্কের অর্ধেকের বেশি অকটেন নিতেন না। তাদের বেশিরভাগ এখন পুরো ট্যাঙ্ক ভর্তি নিচ্ছেন অকটেন। পাশাপাশি যে যেখানে পারছে গড়ে তুলছে অকটেনের মজুদ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির ঊর্ধ্বতন এক মহাব্যবস্থাপক বলেন, অকেটন দেশেীয় বিভিন্ন রিফাইনারি থেকে সরবরাহ আসে। চাহিদা বাড়লে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। গত এক যুগে বিভিন্ন সময় ডিজেলের সংকট হয়েছে। আমদানি করে সেই বাড়তি চাহিদা পূরণ করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে যা ডিজেল মজুদ আছে তাতে বড় ধরনের মজুদ ঘাটতির সম্ভাবনা কম। কিন্তু কখনো আলোচনায় না থাকা অকটেনের সংকট শুরু হওয়ায় আমরা কিছুটা বিস্মিত। একসময় পেট্রোল পাম্পগুলো ডিপো থেকে উত্তোলন করেও বিক্রি করতে পারত না অকটেন। অর্থাৎ উত্তোলন করা অকেটন বেশি সময় অবিক্রীত থাকত।
যানবাহনগুলোর বেশিরভাগ সিএনজিতে রূপান্তর হওয়ায় ডিজেল পেট্রোলের চাহিদা কমেছে। মোটরসাইকেলসহ কিছু যানবাহনে অকটেনের চাহিদা আছে। বর্তমানে ব্যাপক হারে বেড়েছে মোটরসাইকেল। মোটরসাইকেল বৃদ্ধির পরও অকেটেনের সংকট হয়নি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো মতেই যেন অকটেনের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। প্যানিক, মজুদদারি ও বাড়তি নেওয়ার কারণে হঠাৎ চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার এই সময়ে প্যাক পয়েন্ট ডিলাররা মজুদ করছেন বলে মনে করছি। এসব ডিলার হাজার হাজার। সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। শহরের প্যাক পয়েন্ট ডিলারদের দেখা যায়। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার প্যাক পয়েন্ট ডিলারদের তদারকি করা কঠিন।
কোথায় কত উৎপাদন হয় অকটেন : সিলেটের গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় গ্যাসের সঙ্গে পাওয়া যায় কনডেনসেট। এসব কনডেনসেট পাইপ লাইনের অভ্যন্তরে জমে থাকা বর্জ্য হিসেবেও পরিচিত। গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট উঠে আসে। কনডেনসেট গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া এক ধরনের উপজাত জ্বালানি। পরিশোধনের জন্য বেসরকারি রিফাইনরিতে সরবরাহ করা হয় এসব কনডেনসেট। সেখানে পরিশোধন করে উৎপাদন করা হয় ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন। দেশে বছরে পেট্রোলের চাহিদা চার লাখ ৬২ হাজার টন। অকটেনের চাহিদা চার লাখ ১৫ হাজার টন।
মধ্যপ্রাচ্যে থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড) পরিশোধন করে ডিজেলসহ কয়েক ধরনের জ্বালানি তেল উৎপাদন হয়। দেশে বার্ষিক চাহিদার প্রায় সব পেট্রোল উৎপাদন হয় সেখানে। পেট্রোবাংলার কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্লান্ট থেকেও পাওয়া যায় কনডেনসেট। যা পরিশোধন করে উৎপাদন হয় পেট্রোল ও অকটেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কনডেনসেট পরিশোধন করে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার ৬৬২ মেট্রিকটন পেট্রোল এবং ৫৫ হাজার ৩৩৯ মেট্রিকটন অকটেন উৎপাদন হয়েছে।
হবিগঞ্জ অবস্থিত সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসা কনডেনসেট থেকে সবচেয়ে বেশি পেট্রোল ও অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল, এলপিজি উৎপাদন করে। হবিগঞ্জের প্লান্টে প্রতিদিন ৭৪ মেট্রিকটন অকটেন, ৪২০ মেট্রিকটন পেট্রোল, ২০ মেট্রিকটন ডিজেল, ১৩ মেট্রিকটন কেরোসিন, ১ দশমিক ৫ মেট্রিকটন এলপিজি উৎপাদন করা হয়।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের হরিপুর গ্যাস ফিল্ডের দায়িত্বে থাকা উপ-মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) প্রকৌশলী জাফর ইমাম সিদ্দিকী সময়ের আলোকে বলেন, দেশের সিলেট অঞ্চলের গ্যাস ফিল্ড থেকে পরিশোধের জন্য বড় অংশ কনডেনসেট পাওয়া যায়। তার মধ্যে হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্রে পাওয়া যায় কম। তবে এসব কনডেনসেট পরিশোধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট রিফাইনারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পরিশোধন করে অন্য অনেক ধরনের জ্বালানি সঙ্গে উৎপাদন হয় অকটেন। কনডেনসেট পরিশোধন করে পাওয়া অকটেন দিয়ে দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয়।
পাম্প মালিকরা বলছেন জীবনে অকটেন সংকট দেখিনি : অকটেনের হঠাৎ সংকটকে ভাবিয়ে তুলেছে পেট্রোল পাম্প মালিকদের। তারা বলছেন, দেশে ডিজেলের সংকট হয় দেখেছি। কিন্তু অকেটেনের সংকট কখনো হয়নি। অকটেনের চলমান সংকটটা আমাদের কাছে একেবারে নতুন। পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিভাগের সাবেক সভাপতি এহসানুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমার ৬৬ বছর বয়স চলছে। দীর্ঘদিন পেট্রোল পাম্পের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানাধীন ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় আমার পাম্প। দেশে ডিজেলের সংকট হয়। বিভিন্ন সময় ডিজেলের সংকট দেখেছি। কিন্তু এই প্রথম আমি দেখলাম অকটেনের সংকট । আমার পম্পে যারা জ্বালানি তেল নিতে আসে তাদের বেশিরভাগ অকেটেনের জন্য। একশ জনের মধ্যে ৮০ জন মোটরসাইকেল নিয়ে আসে। বাকি ২০ ভাগ প্রাইভেটকার চালক।
তিনি আরও বলেন, ডিজেল সংকটের কথা বলা হলেও ভারী যানবাহনগুলো, বিশেষ করে বাস-ট্রাক কখনো চাপ সৃষ্টি করেনি। তারা যা ডিজেল চায় দিতে পারছি। সমস্যা বাইকারদের অকটেন নিয়ে। এক লিটার অকটেন দিয়ে ৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়া যায়। আগে ২-৩ লিটারের বেশি কোনো বাইক অকটেন নিত না। এখন পুরো ট্যাঙ্ক ভর্তি করে অকটেন নিচ্ছে। তাই আমরা নিশ্চিতভাবে ধরে নিচ্ছি কোথাও অকটেন মজুদ করা হচ্ছে। পাম্প থেকে সংগ্রহ করা অকটেন পরে চড়া দামে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।
সময়ের আলো/আআ