ফরাসি চলচ্চিত্রে নাৎসি সহযোগীর মানবিক রূপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ফ্রান্সে মুক্তি পাওয়া ‘লে রেয়োঁ এ লে অঁব্র’ সিনেমা এখন তীব্র বিতর্কের কেন্দ্র। এটি শুধু একটি পারিবারিক গল্প নয়। বরং

2026-04-06T04:23:19+00:00
2026-04-06T04:23:19+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ফরাসি চলচ্চিত্রে নাৎসি সহযোগীর মানবিক রূপ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:২৩ এএম 
‘লে রেয়োঁ এ লে অঁব্র’ কেবল একটি পারিবারিক গল্প নয়। বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি সমাজের এক অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরে। ছবি : দ্য গার্ডিয়ান
ফ্রান্সে মুক্তি পাওয়া ‘লে রেয়োঁ এ লে অঁব্র’ সিনেমা এখন তীব্র বিতর্কের কেন্দ্র। এটি শুধু একটি পারিবারিক গল্প নয়। বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি সমাজের এক অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরে। এখানে দেখানো হয়েছে, কীভাবে একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক ধীরে ধীরে নাৎসি সহযোগিতে পরিণত হন। আর সেই সত্যকে কীভাবে তার মেয়ে বুঝতে চেষ্টা করেন। কেউ কেউ মনে করছেন, এই নাৎসি সহযোগীকে মানবিক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তার অপরাধের স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে। আর তা নিয়েই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।

কোরিনের স্মৃতি ও বাবার ছায়া : গল্পের কেন্দ্র কোরিন লুশেয়ার। একসময় তিনি জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন। এখন যুদ্ধশেষের এক নিঃসঙ্গ জীবনে তিনি নিজের স্মৃতি রেকর্ড করছেন। তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- তার বাবা কি সত্যিই বিশ্বাসঘাতক ছিলেন? তিনি বাবাকে ভালোবাসতেন। তার চোখে বাবা ছিলেন একজন আকর্ষণীয়, প্রভাবশালী মানুষ। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি জানেন, সেই বাবাই রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। এই দ্বন্দ্বই গল্পের মূল শক্তি।

বাবার আসল পরিচয়: কোরিনের বাবা জ্যঁ লুশেয়ার ছিলেন শুধু সাংবাদিক নন। তিনি ছিলেন এক শক্তিশালী সংবাদপত্র মালিক। তিনি ‘লে নুভো তঁ’ নামের একটি পত্রিকা চালাতেন। নাৎসি দখলদারির সময় এই পত্রিকাটি জার্মানপন্থি প্রচার চালাত। তার শুরুটা ছিল ভিন্ন। তিনি শান্তিবাদী ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তাকে যুদ্ধবিরোধী করে তুলেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি ক্ষমতা, অর্থ আর প্রভাবের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি নাৎসি শাসনের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং তাদের প্রচারযন্ত্রের অংশ হয়ে যান। এটাই তাকে ইতিহাসে এক বিতর্কিত চরিত্র বানিয়েছে।

নাৎসি দখল ও ভিশি বাস্তবতা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি ফ্রান্স দখল করে। তখন ভিশি সরকার গড়ে ওঠে, যারা নাৎসিদের সঙ্গে সহযোগিতা করে। এই সময় ফরাসি সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে প্রতিরোধ আন্দোলন, অন্যদিকে সহযোগিতা। অনেকেই নিজের স্বার্থে নাৎসিদের পাশে দাঁড়ায়। সাংবাদিকতা, রাজনীতি, ব্যবসা- সব জায়গায় এই প্রভাব পড়ে। জ্যঁ লুশেয়ার সেই সহযোগী শ্রেণির প্রতীক।

এক প্রশ্নে ভেঙে যায় কোরিনের দুনিয়া : কোরিনের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে এক পুরোনো ইহুদি পরিচালকের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। এই মানুষটি তার ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করেছিলেন। কোরিন জানতে চান তার বোনের খবর। উত্তরে তিনি জানান, তার বোন নাৎসি শিবিরে মারা গেছেন। কোরিন বলেন, তিনি কিছু জানতেন না। তখন তিনি প্রশ্ন করেন- ‘জানার চেষ্টা করেছিলেন?’এই একটি প্রশ্নই কোরিনের আত্মপ্রবঞ্চনা ভেঙে দেয়। তিনি বুঝতে শুরু করেন, না জানাটা কখনো কখনো ইচ্ছাকৃতও হতে পারে।

বিলাসী জীবন বনাম নির্মম বাস্তবতা : ছবিতে দেখানো হয়েছে, প্যারিসে একদল অভিজাত মানুষ তখন বিলাসী জীবন কাটাচ্ছিল। বাইরে মানুষ কষ্টে ছিল, খাবারের অভাব ছিল। কিন্তু এই শ্রেণি পার্টি করত, দামি খাবার খেত, নাৎসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিশত। এই বৈপরীত্য ছবির গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটি দেখায়, কীভাবে নৈতিকতা হারিয়ে গেলে মানুষ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

বন্ধুত্ব, ক্ষমতা ও পতনের পথ : জ্যঁ লুশেয়ারের জীবনে এক জার্মান কূটনীতিকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সম্পর্ক তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তিনি তথ্য ও প্রচারের নিয়ন্ত্রণ পান। ধীরে ধীরে তিনি আর আগের মানুষ থাকেন না। এই পরিবর্তন হঠাৎ নয়। ধাপে ধাপে ঘটে। আর সেটাই ছবির মূল বার্তা- মানুষ একদিনে খারাপ হয় না, ধীরে ধীরে সেই পথে যায়।

কেন এই সিনেমা নিয়ে এত বিতর্ক : এই ছবির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- এটি কি নাৎসি সহযোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল? অনেক সমালোচক বলছেন, এখানে মূল চরিত্রকে খুব মানবিকভাবে দেখানো হয়েছে। এতে মনে হতে পারে, তিনি পরিস্থিতির শিকার। অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, বাস্তবতা এমনই জটিল। মানুষকে একরঙা করে দেখা ঠিক নয়। এই দ্বন্দ্ব থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বামপন্থি মহল মনে করছে, এতে অপরাধের গুরুত্ব কমে গেছে।

ইতিহাসবিদদের আপত্তি ও ভিন্ন মত : এই সিনেমা নিয়ে সরাসরি আপত্তি জানিয়েছেন ফরাসি ইতিহাসবিদ লঁর জোলি। তিনি ভিশি শাসন ও রাষ্ট্রীয় ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। তার মতে, ছবিতে জ্যঁ লুশেয়ারকে যেভাবে দেখানো হয়েছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। তিনি বলেন, লুশেয়ারকে শুধু পরিস্থিতির শিকার বা দুর্বল মানুষ হিসেবে দেখানো ভুল। বরং তিনি শুরু থেকেই স্বার্থপর, লোভী ও অনৈতিক ছিলেন। খুব অল্প বয়স থেকেই তার মধ্যে প্রতারণার প্রবণতা ছিল। ধীরে ধীরে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তিনি সচেতনভাবেই সেই পথে এগোন।

লঁর জোলি আরও বলেন, কোরিন লুশেয়ারকেও ছবিতে অতিরিক্ত অসহায়ভাবে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে তিনি এতটা ভেঙে পড়া অবস্থায় দীর্ঘদিন ছিলেন না। যুদ্ধের পর তিনি আবার সামাজিক জীবনে ফিরে আসেন এবং নিজের স্মৃতিকথাও প্রকাশ করেন। অন্যদিকে পরিচালক পরামর্শ নিয়েছিলেন আরেক ইতিহাসবিদ পাসকাল অরি-এর কাছ থেকে। তিনি সরাসরি ছবির সমালোচনা না করলেও নির্মাতাকে সতর্ক করেছিলেন। 

তার সেই বিখ্যাত মন্তব্যই এখন আলোচনার কেন্দ্র “একটা মিথ্যা বললে কেউ ক্ষমা করবে না। কিন্তু পুরো সত্য বললেও কেউ ক্ষমা করবে না।”

এই দুই ইতিহাসবিদের অবস্থানই দেখায় কেন ছবিটি এত বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে কঠোর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, অন্যদিকে মানুষের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা- এই দ্বন্দ্ব থেকেই তর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

সত্য বলার ভয় ও নির্মাতার স্বীকারোক্তি : ছবির পরিচালক জাভিয়ে জিয়ানোলি যখন এই গল্প নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন তিনি ইতিহাসবিদদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তিনি চেয়েছিলেন, যেন কোনও ভুল না থাকে। তার ভাষায়, তিনি এমন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করছিলেন যেখানে একটি ভুলও মানুষ মেনে নেবে না। একজন খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ তাকে সতর্ক করে বলেন- ‘তুমি যদি একটি মিথ্যাও বলো, কেউ তোমাকে ক্ষমা করবে না।”

কিন্তু এরপরই তিনি আরও কঠিন একটি কথা যোগ করেন- ‘তুমি যদি পুরো সত্যও বলো, তবু কেউ তোমাকে ক্ষমা করবে না।’ এই কথাটিই আসলে ছবির মূল দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। কারণ, এই গল্প এমন এক সময়ের, যেখানে মানুষ স্পষ্টভাবে ভালো বা খারাপ- এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় না। অনেকেই নিজেদের সুবিধা, ভয় বা দুর্বলতার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখন সেই বাস্তবতা দেখালে কেউ সেটাকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখে, আবার কেউ সেটাকে অপরাধকে হালকা করা বলে মনে করে।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   ফরাসি  চলচ্চিত্র  নাৎসি  সহযোগী  মানবিক. রূপ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: