উত্তর ইরাকের পাহাড়ে বৃষ্টি পড়ছে। চারপাশে ধ্বংসস্তূপ। ড্রোন হামলায় বিধ্বস্ত একটি ঘাঁটির সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন নারী। তাদের হাতে কালাশনিকভ। এই নারীরা ইরান থেকে পালিয়ে এসেছে। কেউ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল, কেউ নিরাপত্তা বাহিনীর হুমকি থেকে বাঁচতে। এখন তারা পেশমেরগা যোদ্ধা।
দ্য হেরাল্ডের ফরেন অ্যাফেয়ার্স এডিটর ডেভিড প্র্যাট তার সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, কীভাবে এই নারীরা জীবন বাজি রেখে লড়াই করছে। অন্যদিকে একই সময়ে আরেকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিক্ষোভকারীদের জন্য কুর্দিদের মাধ্যমে অস্ত্র পাঠিয়েছে। কিন্তু মিডল ইস্ট আইয়ের কাছে কুর্দি নেতারা এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য, তারা কোনো মার্কিন অস্ত্র পায়নি।
দ্য হেরাল্ডে ডেভিড প্র্যাট লিখেছেন, উত্তর ইরাকে কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি বা পিএকের একটি ঘাঁটি সম্প্রতি ইরানের ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এই হামলায় একজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়। এরপরও হামলা থামেনি। প্রায় প্রতিদিনই ড্রোন আঘাত করছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিল নারী যোদ্ধাদের একটি দল। তাদের প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র।
প্র্যাট উল্লেখ করেন, ‘পেশমেরগা’ শব্দের অর্থ যারা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। এই নারীরা সেই বাস্তবতার মধ্যেই বাস করছে। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে কুর্দি ঘাঁটিগুলোর ওপর শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে।
কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব ইরানের তথ্য অনুযায়ী, ৬৫০টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়েছে। অর্থাৎ এই যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়, কুর্দি যোদ্ধাদের ঘাঁটিতেও সরাসরি আঘাত হানছে।
এই নারী যোদ্ধাদের বেশিরভাগই ইরানের ভেতর থেকে পালিয়ে এসেছে।
দ্য হেরাল্ডের প্রতিবেদনে ২০ বছর বয়সি সায়দার কথা বলা হয়েছে। তিনি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর নজরে পড়ে যান। পরিবারকে হুমকি দেওয়া শুরু হলে তিনি পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তার যাত্রা ছিল বিপজ্জনক। গোপন আস্তানা, চেকপোস্ট, নদী পার হওয়া সব মিলিয়ে তিন দিনের কঠিন পথ।
তিনি প্র্যাটকে বলেন, ধরা পড়লে তাকে গ্রেফতার করা হতো এবং তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারত। এই অভিজ্ঞতা শুধু তার একার নয়। প্র্যাট লিখেছেন, অনেক নারী একইভাবে পালিয়ে এসেছে।
২৪ বছর বয়সি গিলারা দ্য হেরাল্ডকে বলেন, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল মাহসা আমিনি হত্যার পরের বিক্ষোভ থেকে। তিনি নিজ চোখে দেখেছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতা। বন্ধুদের হত্যা, নির্যাতন সবই তার সামনে ঘটেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে, যখন তার এক বান্ধবী গ্রেফতারের পর যৌন সহিংসতার শিকার হন। এই ঘটনার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ইরানে থাকা সম্ভব নয়। তিনি প্র্যাটকে বলেন, ধরা পড়ার চেয়ে লড়াই করা ভালো।
এই লড়াইয়ের মাঝেই নতুন একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিক্ষোভকারীদের জন্য কুর্দিদের মাধ্যমে অস্ত্র পাঠিয়েছে। কিন্তু কুর্দি নেতারা এই দাবি অস্বীকার করেছেন। পিজাকের নেতা সিয়ামান্দ মোয়িনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, তারা কোনো অস্ত্র পাননি।
পিএকের প্রতিনিধি হানা ইয়াজদানপানাহ বলেন, তারা এখনও সেই পুরোনো কালাশনিকভ ব্যবহার করছে, যা তারা আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যবহার করেছিল।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি অস্ত্রও পাইনি। একই কথা বলেছেন কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব ইরানের নেতা মুস্তাফা মাওলুদি। তার ভাষায়, অস্ত্র দিয়ে বিক্ষোভ চালানো সম্ভব নয় তা হলে তা যুদ্ধ হয়ে যাবে।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর প্রায় ৬ হাজার সশস্ত্র যোদ্ধা রয়েছে। তবুও তারা সরাসরি এই যুদ্ধে প্রবেশ করেনি। কারণ এতে জটিল রাজনৈতিক ও আইনি সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশ্লেষক শুকরিয়া ব্রাদোস্ত মিডল
ইস্ট আইকে বলেন, বিক্ষোভকারীদের হাতে অস্ত্র দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কারণ তারা প্রশিক্ষিত নয়।
দ্য হেরাল্ডের প্রতিবেদনে ২৭ বছর বয়সি কমান্ডার সারবেক্সয়ের কথা বলা হয়েছে।
তিনি বিশ্বাস করেন, ইরানের সরকার দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে তার লড়াই শুধু বর্তমান যুদ্ধের জন্য নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম।
তিনি বলেন, আমরা ১০০ বছর লড়েছি, আরও লড়ব। তার মতে, তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ইচ্ছাশক্তি।