দ্বিমুখী সংকটে বোরোচাষিরা

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ জনপদ জুড়ে এখন বোরো মৌসুমের ব্যস্ততা থাকার কথা। মাঠভরা সবুজ ধানগাছ, সেচের পানিতে ভেজা জমি আর কৃষকের কর্মচাঞ্চল্যে

2026-04-07T04:32:17+00:00
2026-04-07T04:32:17+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
দ্বিমুখী সংকটে বোরোচাষিরা
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৩২ এএম 
বোরো মৌসুমের ব্যস্ততা। ছবি : সময়ের আলো
গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ জনপদ জুড়ে এখন বোরো মৌসুমের ব্যস্ততা থাকার কথা। মাঠভরা সবুজ ধানগাছ, সেচের পানিতে ভেজা জমি আর কৃষকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকার সময় এটি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, ডিজেল সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির চাপে কৃষকের সেই স্বাভাবিক ছন্দে পড়েছে বড় ধরনের ছেদ। সময়মতো সেচ দিতে না পারা, প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়া এবং বাড়তি খরচের বোঝা সব মিলিয়ে জেলার বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধার সাতটি উপজেলায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৩৬৫ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে অধিকাংশ জমিতে চারা রোপণ শেষ হয়েছে। এখন ধানের শিষ গঠনের সময়, যখন নিয়মিত সেচ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু ঠিক এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই ডিজেলের সংকট কৃষকদের বড় বিপাকে ফেলেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, আগে পেট্রোল পাম্প, ডিলার বা খুচরা দোকান থেকে সহজেই ডিজেল পাওয়া গেলেও এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। অনেক জায়গায় জনপ্রতি এক-দুই লিটারের বেশি জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে না। আবার কোথাও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে সেচ পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে আর এতে ধানের জমিতে পানি দিতে দেরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জমির মাটি শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে, যা ফলনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

জেলার দুর্গম চরাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা যায়, সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় কৃষি ও দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি ডিজেলনির্ভর। সেচ দেওয়া, ভুট্টা মাড়াই, এমনকি নৌকা চালানোÑ সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন শ্যালো মেশিন আর সেটি চালাতে লাগে জ্বালানি তেল। কিন্তু সংকটের কারণে সেই তেল এখন কৃষকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

স্থানীয় নদীবন্দরগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের শহরে গিয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে সময় যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি যাতায়াত খরচও বাড়ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পাম্প থেকে বোতল বা কনটেইনারে তেল বিক্রি না করায় কৃষকরা প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও খালি হাতে ফিরে আসছেন।

এই সংকট শুধু কৃষিকাজেই সীমাবদ্ধ নেই, প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। নৌকায় করে যাতায়াতকারী চরাঞ্চলের মানুষ জ্বালানির অভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, বাজার করা বা জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত সবকিছুই হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত ও ব্যয়বহুল।

বালাসী ঘাটের নৌকাচালক মোন্নাফ গাজীর কথায় সেই দুর্ভোগের চিত্র স্পষ্ট হয়। 

তিনি জানান, আগে ঘাট থেকেই সহজে তেল পাওয়া যেত, কিন্তু এখন শহরে যেতে হচ্ছে। অনেক সময় তেল সংকট থাকায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, এতে যাত্রী পরিবহনেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।

এদিকে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে। কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে চলতি মৌসুমে বিঘাপ্রতি খরচ ১১ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। গত বছর যেখানে এক বিঘা জমিতে ইরি ধান চাষে ১২ হাজার থেকে ১২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হতো, সেখানে এবার সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৪ হাজার ৫০০ টাকায়। ডিজেলের পাশাপাশি সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়াও এই ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। কৃষকদের ভাষায়, উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে এখন বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। ফলে লাভের আশা কমে যাচ্ছে, বরং অনেক ক্ষেত্রে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

সাঘাটা উপজেলার এক কৃষক জানান, ধানের শিষ আসার এই সময়ে নিয়মিত পানি না পেলে ফলন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে পাট চাষের জমি প্রস্তুত করতেও সেচের প্রয়োজন, কিন্তু ডিজেল না পাওয়ায় সেটিও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে একদিকে ধান, অন্যদিকে পাট দুটি ফসলই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

আরেক কৃষক বলেন, অনেক সময় দোকানে ডিজেল পাওয়া গেলেও লিটারপ্রতি ১০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং কৃষক আর্থিক চাপে পড়ছেন। তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু কৃষকই নয়, ভবিষ্যতে ভোক্তাদেরও এর প্রভাব বহন করতে হবে; ধান ও চালের দাম বাড়তে পারে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি তেলের বিষয়টি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, এটি জেলা প্রশাসন দেখভাল করে। তবে সরকার নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী কৃষক যেন জ্বালানি পান, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলে তারা জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে কৃষকদের সুষম সার ব্যবহার ও আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে গাইবান্ধার কৃষিতে এখন এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এই দুই চাপের মধ্যে পড়ে কৃষকরা যেন দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা না মিললে বোরো মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই শুধু নয়, সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


  বিষয়:   গাইবান্ধা  বোরো  মৌসুম 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: