হাকালুকি হাওড়ের পাড়ে বসবাসকারী কৃষক ফেদল মিয়ার জীবনে এক রাতেই নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। উজানের পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে তার ১৪ কিয়ার বোরো ধানক্ষেত। যে জমি ঘিরে ছিল তার পুরো পরিবারের স্বপ্ন ও জীবিকা, সেই স্বপ্ন এখন হাওড়ের পানিতে ভাসছে। ঋণের বোঝা আর বড় পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশাহারা এই কৃষক এখন শুধু তাকিয়ে আছেন দূর আকাশের দিকে।
তিনি বলেন, হাকালুকি হাওড়পাড়ে আমার বাড়ি। ভালোই চলছিল দিনকাল। কিন্তু এক রাতে আমার পরিবারের সব গল্প পাল্টে গেল। আমার সবকিছুই পানিতে ডুবে আছে। চোখের সামনে পচে যাচ্ছে ক্ষেতের ধানগুলো।
তিনি আরও বলেন, আমি ১৪ কিয়ার জমি চাষ করেছিলাম। এখন পুরো জমির ধান পানির নিচে। ধানের থোড় আসার সঙ্গে সঙ্গে পানির নিচে ডুবে গেছে। আমি একটা ধানও পাব না। গত বছর ১৫০ মণ ধান পেয়েছিলাম, যা দিয়ে পুরো পরিবারের চাহিদা মিটেছে। আমার ৬ মেয়ে ও ৪ ছেলে। ফেদল মিয়ার বাড়ি হাকালুকি হাওড়ঘেঁষা মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের বড় মসজিদের কাছে।
তিনি বলেন, আমার ধান হাকালুকি হাওড়ের উগাকাটু ও খাটুয়া বিলে ছিল। গতকাল হাওড়ে গেলাম দেখি পানি কিছুটা কমেছে। আবার আজ গিয়ে দেখি পানি বেড়েই চলেছে। একটু স্বপ্ন দেখলেই যেন ভাটা পড়ে।
তিনি বলেন, জমি আবাদ করতে গিয়ে যে কত ধারদেনা করতে হয়েছে। আমার নিজের, সন্তানের পরিশ্রমসহ নিজের টাকা বাদেও লোন নিতে হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এখন পরিশ্রম তো গেলই লোন কীভাবে পরিশোধ করব এই চিন্তা করলেই ভয় হয়। অন্যদিকে এত বড় পরিবার। কীভাবে কী করব চিন্তা করতে পারছি না। এত বড় ক্ষতি হচ্ছে কিন্তু সরকারও কোনো পদক্ষেপ নেয় না।
তিনি আরও বলেন, গত শুক্রবার রাতে একটানা কয়েক ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি হয়। এ ছাড়া হাওড়ের সঙ্গে যুক্ত জুড়ী, কণ্ঠিনালা, গোগালিছড়া ও ফানাইনদী দিয়ে উজানের পাহাড়ি ঢলের পানি নামে। গত শনিবার সকাল থেকে হাওড়ের উগলা ও হাসইরডিবি বিলে পানি ঢুকতে থাকে। দুপুরের দিকে বিলের ধানক্ষেত তলিয়ে যায়। গতকাল পানি কমছে মনে হয়েছে। কিন্তু আজ আবার পানি বৃদ্ধি শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এবার উপজেলার হাকালুকি হাওড়সহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় ৮ হাজার ৭০৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ভারী বৃষ্টিতে ও উজানের ঢলে হাওড় এলাকার জমিতে পানি প্রবেশ করেছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হলে পানি দ্রুত নেমে যাবে, ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না। প্রায় ৫০০ বিঘার মতো জমিতে পানি উঠেছে। বৃষ্টি হলে পানি বাড়তে পারে।
হাওড়পাড়ের কৃষকরা জানান, গত কয়েক দিন ঝড়বৃষ্টি হয়েছে, সঙ্গে শিলাবৃষ্টিও ছিল। এরকম বিরূপ আবহাওয়ায় হাওড়ের বোরো ধান নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা। হাওড় ও নদীতে পানি বাড়ায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নিমজ্জিত কাঁচা, কোথাও আধা পাকা ধান কাটার চেষ্টা করছেন অনেকে।
কৃষকরা জানান, এ সময় হাওড় এলাকায় বৃষ্টি, ভারী বৃষ্টি, উজানের পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যার শঙ্কা থাকে। যদি এসবের কোনো একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হাওড়ে হয়, তা হলে কৃষকের সর্বনাশ হয়ে যায়।
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওড়ে গিয়ে দেখা যায়, হাওড়ের অনেক জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষকরা পানিতে নেমে সেই ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ গোখাদ্যের জন্য কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছেন। আবার অনেকে পানিতে ভেসে ভেসে ডুবন্ত ধানগুলো কাটার চেষ্টা করছেন।
সময়ের আলো/কেএইচও