তারেক রহমানের শুরু এবং প্রত্যাশার ভার

সাঈদ বারী

মতামত

ইংরেজি একটি প্রবাদ আছে : ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। দিনের শুরুই বলে দেয় তার গতিপথ কেমন হতে পারে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও

2026-04-11T03:27:45+00:00
2026-04-11T03:27:45+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
মতামত
তারেক রহমানের শুরু এবং প্রত্যাশার ভার
সাঈদ বারী
প্রকাশ: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:২৭ এএম   (ভিজিট : ২৮)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ইংরেজি একটি প্রবাদ আছে : ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। দিনের শুরুই বলে দেয় তার গতিপথ কেমন হতে পারে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও অনেক সময় এমনটা দেখা যায়। কোনো নেতার রাজনৈতিক যাত্রার শুরু, তার ভাষা, আচরণ, সিদ্ধান্ত ও দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই আজ অনেকের দৃষ্টি নিবদ্ধ আছে তারেক রহমানের দিকে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান নতুন কোনো নাম নন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আলোচনায় আছেন। কখনো প্রশংসায়, কখনো সমালোচনায়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তিনি এখন এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে তাকে নতুন করে মূল্যায়নের প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের কাছে তিনি সম্ভাবনার প্রতীক। আবার অনেকের কাছে তিনি এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি রাজনীতিক।

তারেক রহমানের রাজনীতি বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রেক্ষাপট হলো তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে পরিচিত শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান। এই পরিচয় তাকে যেমন রাজনৈতিক পরিচিতি দিয়েছে, তেমনি দিয়েছে বিশাল প্রত্যাশার বোঝা।
আরও পড়ুন

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। স্বল্পসময়ে তিনি প্রশাসনিক দক্ষতা, সংগঠকসুলভ নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি দলকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই দুই নেতার উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমানের ওপর মানুষের দৃষ্টি বেশি।

প্রশ্ন হলো, তারেক রহমানের শুরুটা কী বলছে?
রাজনীতিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। ছাত্রজীবনে সরাসরি রাজনীতিতে না থাকলেও নব্বইয়ের দশকের পর থেকে তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। বিশেষ করে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে তার ভূমিকা ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে থাকে। অনেকেই মনে করেন, দলকে পুনর্গঠনের প্রশ্নে তিনি পরিকল্পনামুখী একটি দৃষ্টিভঙ্গি দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

রাজনীতির ইতিহাসে দেখা যায়, উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতিতে আসা নেতাদের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকে। প্রথমত নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা। দ্বিতীয়ত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রত্যাশার ভার সামলানো। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও এই দুই চ্যালেঞ্জ সমানভাবে প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা জটিল। এখানে দলীয় রাজনীতি যেমন শক্তিশালী, তেমনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের প্রভাবও প্রবল। ফলে কোনো নেতাকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে জনগণ শুধু তার বক্তব্য শোনে না, তার আচরণ, ধৈর্য, সহনশীলতা এবং দূরদর্শিতাও বিচার করে।

অনেকের মতে, তারেক রহমানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো সাংগঠনিক মনোযোগ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দলীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার কথা বলে আসছেন। বিভিন্ন সময় তিনি রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার চেষ্ট সংযোগ রক্ষা করেছেন। এই বিষয়গুলো তার নেতৃত্বের ধরন সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়।

তবে নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা সবসময় কঠিন পরিস্থিতিতেই হয়। রাজনীতিতে প্রতিকূলতা, সমালোচনা এবং বিরোধিতার মুখোমুখি হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। একজন নেতার শক্তি তখনই বোঝা যায়, যখন তিনি চাপের মধ্যে থেকেও স্থির থাকতে পারেন।

বাংলাদেশের অনেক মানুষ আজ রাজনীতিতে পরিবর্তনের আশা করেন। তারা একটি দায়িত্বশীল, সহনশীল এবং উন্নয়নমুখী নেতৃত্ব দেখতে চান। এই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই অনেকের দৃষ্টি পড়েছে তারেক রহমানের দিকে।

এর একটি কারণ হলো প্রজন্মগত পরিবর্তনের প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের নেতৃত্ব দেখা গেছে। নতুন সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অনেকেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। তারেক রহমানকে অনেকে সেই সম্ভাব্য নেতৃত্বের অংশ হিসেবে দেখতে চান।

আরেকটি কারণ হলো রাজনৈতিক বাস্তবতা। একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে তিনি এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন। ফলে তার সিদ্ধান্ত, বক্তব্য এবং কৌশল দলীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। 

অনেকেই আশা করেন, তিনি যদি সংলাপমুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পথে এগোন, তা হলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে আশার পাশাপাশি উদ্বেগও আছে। কারণ রাজনীতিতে প্রত্যাশা যত বড় হয়, চাপও তত বড় হয়ে ওঠে।

তারেক রহমানের ক্ষেত্রে সেই চাপ আরও বেশি। কারণ তার সঙ্গে তুলনা করা হয় বাবা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের সঙ্গে। আবার তাকে দেখা হয় তার মা খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে। এই দুই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করা সহজ কাজ নয়।

কিন্তু ইতিহাসে অনেক সময় দেখা গেছে, বড় প্রত্যাশাই বড় নেতৃত্ব তৈরি করে। যদি কোনো নেতা সেই প্রত্যাশাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারেন, তা হলে তা তার শক্তিতে পরিণত হয়। আর যদি সেই চাপ তাকে অস্থির করে তোলে, তা হলে সেটাই হয়ে ওঠে তার দুর্বলতা।

তাই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমান কি এই চাপ সামলাতে পারবেন?
এর উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। রাজনীতি একটি দীর্ঘ পথের যাত্রা। এখানে এক দিনের সিদ্ধান্ত বা একটি বক্তৃতা দিয়ে সবকিছু বিচার করা যায় না। সময়ই শেষ পর্যন্ত বলে দেয় একজন নেতার প্রকৃত সক্ষমতা।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। আজকের বাংলাদেশে মানুষ রাজনীতিতে নতুন আশা দেখতে চায়। তারা সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতা চায়। প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহযোগিতা চায়। উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের মধ্যে ভারসাম্য চায়। যেকোনো নেতার জন্য এই প্রত্যাশাগুলোই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

তারেক রহমান যদি এই প্রত্যাশাগুলোকে গুরুত্ব দেন, যদি তিনি ধৈর্য ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন, তা হলে তার সামনে সম্ভাবনার দরজা খোলা আছে। কিন্তু যদি তিনি সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে না পারেন, তা হলে ইতিহাস খুব দ্রুতই তার বিচার করে ফেলবে।

প্রবাদটি আবার মনে করা যাক : ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। শুরুর ইঙ্গিত অনেক কিছু বলে দেয়। তবে দিনের শেষটা নির্ভর করে পুরো যাত্রার ওপর। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও সেটিই সত্য। তার শুরু নিয়ে আলোচনা আছে। সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে তার সিদ্ধান্ত, তার নেতৃত্ব এবং মানুষের আস্থা অর্জনের ক্ষমতার ওপর।

বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষা করছে। সময়ই বলবে, এই প্রত্যাশার গল্প শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

প্রকাশক ও কলাম লেখক

এএডি/


  বিষয়:   তারেক রহমান  সাঈদ বারী  বিএনপি 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: