ইস্তানবুলে থাকা আমার পরিচিত এক ইরানি নারী গত কয়েক মাসে ফোন থেকে মনোযোগ সরাতেই পারেননি। তার ইন্টারনেট আছে, কিন্তু ইরানে থাকা তার মেয়ে ও জামাইয়ের নেই। তারা তেহরান ছেড়ে দেশের উত্তরে আশ্রয় নিয়েছে। তিনি শুধু কয়েক সেকেন্ডের যোগাযোগের জন্যও সবকিছু করতে রাজি। তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তারা কি ভালো আছে? তারা কি ঠিক আছে? তার বুক ভরা উৎকণ্ঠা, মুখে অভিশাপ আর চোখে অশ্রু। তিনি তাদের সঙ্গে অন্তত একবার কথা বলতে চান, শুধু এটুকু জানার জন্য যে তারা নিরাপদ আছে কি না। কিন্তু আসল সমস্যা এত সহজ নয় যে কয়েক সেকেন্ডের কথায় মিটে যাবে। বড় প্রশ্ন হলো, এরপর কী ঘটবে তা কেউই জানে না। আরও কঠিন বিষয় হলো এই যুদ্ধে আদৌ কিছু বদলাবে কি না, সেটাও অনিশ্চিত। তবে এক স্থায়ী সংকটের মধ্যে নিপতিত হয়েছে তেহরান। জ্যাকোবিন।
যদিও এখন একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে, তবু ইরানের দৈনন্দিন জীবনে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তা একটুও কমেনি। ভিন্ন কারণে হলেও ওয়াশিংটন এবং তেহরান দুই পক্ষই এই বিরতিটা চাইছে। ট্রাম্প এই সংঘাতকে ইতিমধ্যে শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখাতে চাইছেন। আর ইরান, তার জেদি অবস্থান সত্ত্বেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য সময় চায়।
পশ্চিমা রাজনৈতিক মহলে একটা ধারণা প্রচলিত ছিল এই যুদ্ধ ইরানে একটা বড় ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে। চাপ ও বিশৃঙ্খলা হয়তো সরকারকে দুর্বল করবে এবং নতুন কোনো ব্যবস্থার পথ খুলে দেবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক বিশ্লেষক ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ‘জম্বি রেজিম’ বলে উল্লেখ করেছেন; যা কেবল দমনপীড়নের ওপর টিকে আছে। তাদের মতে, এই দুর্বলতা একসময় ‘গরবাচেভ মুহূর্তে’ রূপ নিতে পারে। ২০২৬ সালের শুরুতে হওয়া প্রতিবাদ ও অর্থনৈতিক সংকটকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য কৌশলগত সুযোগ হিসেবেও দেখা হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারি ২৮-এর মার্কিন-ইসরাইলি হামলাকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হয়। শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ পর্যায়কে আঘাত করে একটি নেতৃত্বহীন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে বাইরে থেকে সরকার পরিবর্তন চাপিয়ে না দিয়ে ভেতর থেকেই ভেঙে পড়ে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ইরান নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা অনেক কঠিন।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হোসেইন আসকারির ভাষায়, ‘ইরান এক ধরনের পেষণ যন্ত্রে আটকে গেছে।’ তিনি বলেন, ইরানের মানুষকে ঠিক করতে হবে তারা কী করবে। সমস্যার বড় অংশ সরকারের কারণে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাষ্ট্রের কারণেও। যুক্তরাষ্ট্র কখনো নিজের স্বার্থের বাইরে কিছু করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। এটি শুধু ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, বরং সংকটের প্রকৃতি বোঝার একটি চাবিকাঠি। ইরান কোনো বড় ভাঙনের দিকে যাচ্ছে না, বরং এক ধরনের চাপের মধ্যে সংকুচিত অবস্থার দিকে যাচ্ছে।
এই সংকোচন বলতে বোঝানো হচ্ছে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ একসঙ্গে বাড়তে থাকবে, কিন্তু কোনো স্পষ্ট ভাঙন তৈরি হবে না। বরং পুরো ব্যবস্থাকে আরও শক্ত করে বেঁধে মানুষের সম্মিলিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ কমিয়ে দেবে। এই চাপ শুধু রাষ্ট্রে নয়, সমাজেও বিরাজ করছে। আসকারির মতে, মানুষের অনুভূতির পরিসর খুব বিস্তৃত। কেউ দেশে ফিরে সম্পদ ফিরে পেতে চায়, কেউ ক্ষমতায় যেতে চায়, কেউ শুধু পরিবর্তন চায়, আবার কেউ অলৌকিক কিছু ঘটার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু কোনো জাদুকরী সমাধান নেই।
ইতিহাসবিদ পেইমান জাফারির মতে, অনেক ইরানি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করে না, কিন্তু তারা এমন এক পরিস্থিতিতে আটকে আছে যেখানে একদিকে দমনমূলক রাষ্ট্র, অন্যদিকে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ। ফলে সৃষ্টি হয়েছে গভীর বিভ্রান্তি। অক্সফোর্ডের ইয়াসামিন মাদারের ভাষায়, ইরানিরা দুই ধরনের ভয়ের মধ্যে আটকে আছে। একদিকে স্বৈরশাসনের ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে এর পতনের পর সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা। এই দুই ভয় একত্র হলে মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জাফারি বলেন, সাধারণ মানুষ এখন বেঁচে থাকার সংগ্রামেই ব্যস্ত।
বাইরের হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ এটি পরিবর্তন সৃষ্টি করে না, বরং তা নিয়ন্ত্রণ করে। জাফারির মতে, এর উদ্দেশ্য হলো নিচ থেকে পরিবর্তনকে ঠেকানো এবং ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। লিবিয়া ও ইরাকের উদাহরণে দেখা গেছে রাষ্ট্র ভেঙে গেলেও স্থিতিশীল বিকল্প তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সমাজ দুর্বল হয়, আর রাষ্ট্র অন্তত বাহ্যিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সামরিক কাঠামো আরও কেন্দ্রীভূত হয়। মাদারের মতে, এই ধরনের হস্তক্ষেপ গণতন্ত্র আনে না, বরং আরেকটি ব্যর্থ রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে। জাফারি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই ইরানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখায়নি।
এই পুরো ব্যবস্থাকে শুধু রাজনৈতিক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি অর্থনৈতিকও। ইসলামি প্রজাতন্ত্র একদিকে সাধারণ মানুষের উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনসমর্থন তৈরি করেছে, অন্যদিকে এমন এক পুঁজিবাদী কাঠামো বজায় রেখেছে যেখানে রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠী লাভবান হয়। এই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা একে অপরকে শক্তিশালী করে। তাই শুধু সরকার পরিবর্তন হলেই পুরো ব্যবস্থা বদলাবে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈষম্য আরও বেড়েছে। প্রায় ৮৫ শতাংশ শিল্প বেসরকারিকরণ হয়েছে। ফলে একদিকে অনিরাপদ শ্রমজীবী মানুষ, অন্যদিকে অল্প কয়েকজনের হাতে বিপুল সম্পদ জমেছে। এখানে দারিদ্র্য কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং এই ব্যবস্থারই ফল। ধারণা করা হয় দারিদ্র্য বাড়লে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা সংগঠনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অর্থনৈতিক সংকট প্রতিবাদ তৈরি করে, কিন্তু তা সরকার পতনে পরিণত হয় না। দারিদ্র্য ক্ষোভ তৈরি করে, কিন্তু শক্তি তৈরি করে না।
ইরানের ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের সময়গুলোতে শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে রাস্তায় আন্দোলন ছিল, কিন্তু তেল শ্রমিকদের ধর্মঘটই শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়। আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। শ্রমিকদের সংগঠন দুর্বল, কর্মক্ষেত্র অনিরাপদ। তবু সংগ্রামের ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বাইরের দৃষ্টিতে অনেকেই মনে করে রাজতন্ত্র ফিরে আসতে পারে। কিন্তু ইরানের ভেতরে এর সমর্থন খুব কম। মানুষ প্রশ্ন করে আমরা কি সমতার সমাজ চাই, নাকি আবার স্বৈরশাসনে ফিরতে চাই? রেজা পাহলভির মতো নেতাদের প্রতি সন্দেহও প্রবল। কারণ তারা দেশের বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন।
অনেক সময় মনে করা হয় যুদ্ধ সরকারকে দুর্বল করে। কিন্তু বাস্তবে এটি উল্টো ফলও দিতে পারে। বেসামরিক মানুষের মৃত্যু জাতীয়তাবাদ বাড়াতে পারে এবং শাসনের প্রতি সমর্থনও বাড়াতে পারে। সবশেষে প্রশ্ন একটাই। আর তা হলো, এর সমাধান কী? আসকারির মতে, কোনো সহজ সমাধান নেই। স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি এড়াতে শাসকরা পরিবর্তন এড়িয়ে যায়। এই বাস্তবতা এখনও একই আছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, দমনপীড়নের মধ্যেও। ইরান কোনো ভাঙনের দিকে যাচ্ছে না, বরং এক ধরনের পুনর্গঠনের দিকে এগোচ্ছে। এই যুদ্ধ যদি এখানেই থেমেও যায় ভেতরের দমননীতি ও বাইরের চাপের দ্বন্দ্ব দূর করবে না। বরং এটি শুধু সেই শর্তগুলো বদলাবে, যার মধ্যে এই ব্যবস্থা টিকে থাকবে।
লেখক : ডয়চে ভেলের একজন সংবাদদাতা ও প্রবীণ সাংবাদিক। লা প্যারিসিয়েন মাতিনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ফিচার রাইটার।