জেগে ওঠা ব্রহ্মপুত্রের চরে চাষাবাদ

শামীম সরকার, হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)

সারাদেশ

একসময় যেখানে ছিল হাহাকার, ভাঙনের ভয়াল থাবায় হারিয়ে যাওয়া বসতভিটা আর অশ্রুসিক্ত দিনরাত্রি, সেই ব্রহ্মপুত্রের বুকেই আজ জেগে উঠেছে নতুন

2026-04-13T03:41:02+00:00
2026-04-13T03:41:02+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
জেগে ওঠা ব্রহ্মপুত্রের চরে চাষাবাদ
শামীম সরকার, হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৪১ এএম 
কিশোরগঞ্জের ব্রহ্মপুত্র নদে জেগে ওঠা বালুচরে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হচ্ছে। ছবি : সময়ের আলো
একসময় যেখানে ছিল হাহাকার, ভাঙনের ভয়াল থাবায় হারিয়ে যাওয়া বসতভিটা আর অশ্রুসিক্ত দিনরাত্রি, সেই ব্রহ্মপুত্রের বুকেই আজ জেগে উঠেছে নতুন আশার আলো। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের সাহেবের চরসংলগ্ন ‘আলকুবা নতুন চর’ এখন আর নিঃস্বতার প্রতীক নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে সংগ্রাম, সাহস আর স্বপ্নপূরণের এক জীবন্ত কাব্য।

প্রকৃতির নির্মম খেলায় একদিকে ভাঙে, অন্যদিকে গড়ে, এই চিরন্তন নিয়মে একসময় বিলীন হয়েছিল মানুষের ঘরবাড়ি, শেকড় আর স্মৃতি। নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া সেই জনপদের মানুষগুলোই আজ নতুন করে দাঁড়িয়েছে জেগে ওঠা চরের বুকে। চোখে তাদের নতুন দিনের স্বপ্ন, হাতে কঠোর পরিশ্রমের অস্ত্র।

এক সময় বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকা বিস্তীর্ণ বালুচর আজ সবুজের সমারোহে ভরপুর। পলিমাটির উর্বরতায় সোনা ফলাচ্ছেন কৃষকরা। ধান, পাট, ভুট্টা, মরিচ থেকে শুরু করে গম, মসুর, খেসারি, ছোলা, চীনাবাদাম, মিষ্টি আলু, পেঁয়াজ, রসুন, তিল, তিসি, কালোজিরা, আখ ও মাষকলাই,নানা ফসলের আবাদে মুখর হয়ে উঠেছে এই জনপদ। যেন এক নীরব কৃষি বিপ্লব, যেখানে প্রতিটি ফসলের দানায় লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার গল্প।

চরের বুক চিরে এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে এসে নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষগুলো এখানে গড়ে তুলেছেন নতুন সমাজ। নেই পাকা রাস্তা বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, তবু রয়েছে বেঁচে থাকার দৃঢ়প্রত্যয় আর একে অপরকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি।

স্থানীয় বাসিন্দা নাসির মিয়া স্মৃতির ভারে কাঁপা কণ্ঠে বলেন, নদী আমাদের সব কেড়ে নিয়েছিল। অন্য জেলায় গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। এখন আবার নিজের জমি ফিরে পেয়ে নতুন করে ঘর তুলেছি, এটাই আমাদের বাঁচার আশা।
ষাটোর্ধ্ব কৃষক মফিজ মিয়া বলেন, বর্ষায় সব পানির নিচে থাকে, কিন্তু পানি নামার পর পলি মাটি জমিকে উর্বর করে দেয়। এই জমিই এখন আমাদের জীবন।

মুনসুর নামের আরেক কৃষক জানান, পাঁচ মাস পানি থাকে, তারপর সেই পলি মাটিতেই আবাদ করি। আলাদা করে সার দিতে হয় না। খরচ কম, ফলন ভালো- এই চরের মাটিই আমাদের ভরসা। তবে এত সম্ভাবনার মাঝেও রয়েছে অবহেলার দীর্ঘশ্বাস। কৃষকদের অভিযোগ, এত বড় সম্ভাবনাময় চরে নেই কৃষি বিভাগের নিয়মিত নজরদারি বা সহায়তা। 

সেচের জন্য নেই কোনো ব্যবস্থা। তাদের দাবি, শুষ্ক মৌসুমে যদি গভীর নলকূপ বা আধুনিক সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়, তবে এই চরই হতে পারে দেশের অন্যতম শস্যভান্ডার। প্রকৃতির রূপও এখানে অনন্য। 

বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, দূরে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্রের শান্ত স্রোত, ভোরের কুয়াশা আর সন্ধ্যার রঙিন আকাশ- সব মিলিয়ে এই চর যেন এক জীবন্ত চিত্রপট। কিন্তু এই সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত সংগ্রামের গল্প, চোখের জলের ইতিহাস।

ব্রহ্মপুত্রের এই জেগে ওঠা চর আজ প্রমাণ করে, প্রকৃতি যেমন কেড়ে নিতে জানে, তেমনি ফিরিয়েও দিতে পারে নতুন সম্ভাবনা। আর মানুষ যদি হার না মানে, তবে ভাঙনের বুকেও গড়ে ওঠে স্বপ্নের সবুজ রাজ্য।

সময়ের আলো/কেএইচও 


  বিষয়:   ব্রহ্মপুত্র  চর  চাষাবাদ 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: