মানবজীবনে অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক জীবনের দ্রুতগতি, প্রতিযোগিতা এবং অনিশ্চয়তার ভিড়ে মানুষ খুঁজে ফেরে একটুখানি শান্তি, একটুখানি স্বস্তি। ইসলাম এই চাহিদার গভীর সমাধান দিয়েছে আল্লাহর স্মরণ বা জিকিরের মাধ্যমে অন্তরের প্রশান্তি অর্জনের পথে আহ্বান জানিয়ে।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়’ (সুরা রাদ : ২৮)। এই আয়াতটি মানব মনের প্রকৃত চাহিদার দিকে গভীরভাবে ইঙ্গিত করে। দুনিয়ার বাহ্যিক সম্পদ, পদমর্যাদা বা ভোগবিলাস কখনোই অন্তরের স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। বরং অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি নিহিত রয়েছে একমাত্র আল্লাহর স্মরণে।
জিকির মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে, তাকে আল্লাহর নৈকট্যের অনুভূতি দেয় এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি স্মরণ করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের ন্যায়’ (সহিহ বুখারি)।
এই হাদিস আমাদের বুঝিয়ে দেয়, জিকিরহীন হৃদয় প্রকৃতপক্ষে প্রাণহীন হয়ে পড়ে, আর জিকির হৃদয়ে জীবন ও আলো সঞ্চার করে। জিকির কেবল মুখে উচ্চারণের বিষয় নয়; এটি একটি অন্তর্গত চেতনা, যা মানুষের চিন্তা, কথা ও কাজে প্রতিফলিত হয়। আল্লাহকে স্মরণ করার অর্থ হলো তাঁর মহত্ত্ব, ক্ষমতা ও উপস্থিতিকে সর্বদা হৃদয়ে ধারণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো।’ (সুরা আহজাব : ৪১-৪২)
যখন একজন মুমিন তার প্রতিদিনের জীবনে জিকিরকে অভ্যাসে পরিণত করে, তখন তার হৃদয় ধীরে ধীরে কঠোরতা থেকে কোমলতায় রূপ নেয়, উদ্বেগ থেকে প্রশান্তিতে ফিরে আসে। জীবনের নানা পরিস্থিতিতে জিকির একজন মুমিনের জন্য আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। দুঃখ-দুর্দশা, বিপদ-আপদ কিংবা একাকিত্ব- সব অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ মানুষকে মানসিক শক্তি জোগায়।
এটি তাকে হতাশা থেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহর প্রতি আস্থা ও ভরসা বাড়িয়ে দেয়।
বর্তমান সময়ে মানুষের অন্তরের অশান্তি বেড়েই চলেছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, তথ্যের প্রবাহ এবং জীবনের জটিলতা মানুষকে অনেক সময় মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে জিকির অন্তরের অশান্তি দূর করার এক শিফাময় আমল। নিয়মিত ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠ হৃদয়ে প্রশান্তির স্রোত বয়ে আনে।
আল্লাহর স্মরণ একজন মুমিনের জীবনের প্রাণশক্তি। এটি তাকে দুনিয়ার বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে এবং আখেরাতমুখী করে তোলে। যে ব্যক্তি আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে, তার অন্তর ততবেশি শান্ত ও দৃঢ় হয়। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে জিকিরকে অন্তরে ধারণ করা একজন প্রকৃত মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও সফলতার পথ।
সময়ের আলো/আআ