ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শহিদ আবরার ফাহাদ ছাত্র হল-১ এর নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। হলটির বিভিন্ন স্থাপনায় সাবমারসিবল পাম্প, টাইলস, দরজা ও হেজ বলসহ অনুমোদনহীন উপকরণ ব্যবহার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে এসব উপকরণের দাম, স্থায়িত্ব ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে। ফলে তারা কোনো বিল পাবে না। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট উপকরণগুলো অপসারণ করা হবে।
জানা গেছে, ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের অধীন শহিদ আবরার ফাহাদ হলের নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ইবিএল এম ইসলাম জেভি’। শিডিউল অনুযায়ী, হলটির বিভিন্ন স্থানে সিরামিক টাইলস ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে পাথরের টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, হলটির প্রথম তলার লিফটের সামনের দেয়ালে সিরামিক টাইলস বসানো হয়েছে। তবে দ্বিতীয় তলায় বসানো হয়েছে পাথরের টাইলস।
এদিকে হলটিতে ইউরোপীয় মানের সাবমারসিবল পাম্পের পরিবর্তে নিম্নমানের চাইনিজ পাম্প বসানো হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন দরজা, হেজবেল ও মার্বেল ব্যবহার এবং লিফট নিয়ে গড়িমসির অভিযোগও উঠেছে। ইতোমধ্যে অনুমোদিত এসব সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসায় বিভিন্ন সাইটের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্মাণকাজে ধীরগতির অভিযোগও রয়েছে। হলটির কাজ শেষ দিকে হলেও গ্লাস ও টাইলস স্থাপন, বৈদ্যুতিক ক্যাবলিং, ডাইনিং ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ বেশ কিছু কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ফলে এ বছরের মার্চে হলটি উদ্বোধনের কথা থাকলেও তা এখনো হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী প্রশাসন অর্থ পরিশোধ করলেও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর্থিক চাপে পড়েছে। ২০১৪ সালের রেট শিডিউলে প্রকল্পটি অনুমোদিত হওয়ায় ব্যয়ের সঙ্গে বিলের অমিল তৈরি হয়েছে। যেখানে দুই কোটি টাকার বিলে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ কারণে লোকসানের আশঙ্কায় ঠিকাদাররা কাজে অনীহা দেখাচ্ছে। তবে কাজ চলমান থাকলেও শ্রমিক সংকটের কারণে তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ঈদুল আজহার পর এই হলটিন একটি ভবন খুলে দেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি ও আবরার হলের ম্যানেজার মো. আব্দুস সামাদ বলেন, সংশ্লিষ্ট টাইলসের পূর্ণ অনুমোদন না থাকলেও আংশিক অনুমোদনের ভিত্তিতে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়েছিল। তবে প্রকৌশলী অফিসের পছন্দ না হওয়ায় সেগুলো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন টাইলস এনে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর পুনরায় বসানো হবে।
অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী শরীফ উদ্দিন আংশিক অনুমোদনের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, অনুমোদন ছাড়াই ছুটির দিনে টাইলসগুলো বসানো হয়েছিল। এগুলো সরানোর ব্যবস্থা করছি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আরেক প্রতিনিধি নুরুল ইসলাম জানান, প্রচলিত চায়নিজ সাবমারসিবল পাম্প বসানো হয়েছে। তবে চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপীয় পাম্প প্রয়োজন হলে পুনরায় তক স্থাপন করা হবে। অন্যান্য অভিযোগগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি।
কবে নাগাদ হলের কাজ শেষ হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করে চলতি মাসেই ভবনটি হস্তান্তরের পরিকল্পনা আছে। নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমরা চাপে আছি।
হলটির তত্ত্বাবধায়ক ও প্রকৌশলী মো. আব্দুল মালেক জানান, টেন্ডার অনুযায়ী ইউরোপীয় মানের পাম্প বসানোর কথা থাকলেও ঠিকাদার চাইনিজ পাম্প বসিয়েছে, যা টেকসই নয় এবং ভবিষ্যতে এর কারণে পানির সংকট তৈরি হতে পারে। এর আগে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও অন্য কারো সিদ্ধান্তে ঠিকাদার এই পাম্প বসিয়েছে।
পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. নওয়াব আলী বলেন, এখনো ভিজিলেন্স টিম আমাকে লিখিত কোনো নোটিশ দেয়নি। তবে অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে ঠিকাদারকে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হবে।
ভিজিলেন্স টিমের প্রধান ও ইবির কোষাধ্যক্ষ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অনুমোদন ছাড়াই পাম্প ও মার্বেলসহ বিভিন্ন উপকরণ স্থাপন করা হয়েছে। তাই এসব কাজের বিপরীতে কোনো বিল দেওয়া হবে না। এর আগেও প্রতিষ্ঠানটি নকশাবহির্ভূত ২০০টি দরজা আনা হয়েছিল, যা পরে অপসারণ করা হয়।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগেও বিভিন্ন বিষয়ে জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এসব জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এ নিয়ে কোষাধ্যক্ষ ও প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) সঙ্গে আলোচনা করবো।
সময়ের আলো/জোই