কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার নায়ক তার প্রেয়সীর মন পাওয়ার জন্য ‘সমস্ত বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে’ এনেছিলেন ১০৮টি নীল পদ্ম। সাহিত্যে সেই নীল পদ্মের এ রকম সরব উপস্থিতি থাকলেও বাস্তবে তার দেখা মেলে না। সাহিত্যে সাদা পদ্মের বিষয়ে কোনো ছন্দ বা লেখা চোখে না পড়লেও বাস্তবে তার দেখা মিলেছে কবি জীবনানন্দের শহরের হিমনীড় পুকুরে।
বর্ষায় আকাশ এখনও পুরোপুরি ভিজে ওঠেনি। মেঘ জমে ওঠে ঠিকই, কিন্তু সেই টানা বৃষ্টির দিন আসেনি। বৃষ্টি নামার চেনা গন্ধও ভেসে আসেনি কবি জীবনানন্দের এই শহরে। তবু হিমনীড় পুকুরপাড়ে দাঁড়ালে মনে হয়, ঋতু যেন একটু আগেভাগেই দরজা ঠেলে ঢুকে পড়েছে এখানে।
জলের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে সাদা পাপড়ি ফোটানো অজস্র পদ্ম। একটি-দুটি নয়, পুকুরের প্রায় ৮০ শতাংশজুড়েই শুভ্রতার ছড়াছড়ি। নীরব এই স্বচ্ছতা চোখে লাগার মতো প্রশান্তির। যা ভাষায় ধরা কঠিন। শুধু অনুভবেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। কারণ বরিশালের বিআইডব্লিউটিএর পদ্মপুকুরে ফুটেছে হাজারো শ্বেতপদ্ম। তাও সময়ের আগেই। যা দেখলে মন-প্রাণ আর চোখ জুড়িয়ে যায়। পাপড়ি মেলে প্রকৃতি প্রেমীদের স্বাগত জানায় জলজ ফুলেল রানী পদ্ম। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজ ক্ষেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে অসংখ্য সাদা বক। তবে যতই কাছে যাওয়া যায়, ততই চোখে ফুটে উঠছে সাদা রঙের শ্বেতপদ্মের অপরূপ দৃশ্য। পানির ওপর গোল পদ্মপাতাগুলো ভেসে আছে। এর ফাঁকে ফাঁকে মাথা উঁচু করে ফুটেছে পদ্ম। কোনোটি সম্পূর্ণ ফোটা, কোনোটি আধো-ফোটা, আবার কোনোটি শুধুই কলি।
আরও পড়ুন
ঋতুর নিয়ম ভেঙে ফুলের আগমন- বাংলার বর্ষাঋতু সাধারণত জুনের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসজুড়ে তার পূর্ণ রূপ। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টির আনাগোনা থাকে। শীতের তীব্রতা নামে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে, পৌষ-মাঘের সময়। শ্বেতপদ্মের নিজস্ব এক ঋতুচক্র আছে। এই জলজ ফুল সাধারণত গ্রীষ্মের শুরুতে ফুটতে শুরু করে। এপ্রিল থেকে জুলাই, অর্থাৎ বৈশাখ থেকে আষাঢ়- এই সময়েই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। উষ্ণ আবহাওয়া আর রোদই তার প্রিয় সঙ্গী। ভোরবেলা ধীরে ধীরে ফোটে, দিন বাড়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। আবার তীব্র রোদে তেজে কখনো একটু সংকুচিতও হয়।
সাধারণত বর্ষাই পদ্ম ফোটার আসল মৌসুম। বৃষ্টি নামলেই একে একে ফুটে ওঠে শ্বেতপদ্ম। অনেক প্রকৃতিপ্রেমীর ভিড় জমে পুকুরপাড়ে। কিন্তু এ বছর ছবিটা আলাদা। বর্ষা পুরোপুরি নামার আগেই হিমনীড়ের পদ্মপুকুরে মিলেছে আগাম সাড়া।
স্থানীয়দের কাছে বিষয়টি যেমন বিস্ময়ের, তেমনি আনন্দেরও। জীবনানন্দ গবেষক কবি হেনরী স্বপন বলছিলেন, ‘ভাবিনি এত তাড়াতাড়ি ফুটবে। মনে হচ্ছে, পদ্মভরা পুকুরটাই এবার তাড়া দিচ্ছে বর্ষার আগমনিকে।’
দূর থেকে দেখা, তবু ভিড় থামে না- শ্বেতপদ্মের এই আগাম উপস্থিতি প্রতিদিনই টানছে সৌন্দর্যপিপাসু হাজারো মানুষকে।। দলে দলে আসছেন সৌন্দর্যপ্রেমীরা। তাদের কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। তবে পুকুরটি চারদিক থেকে নিরাপত্তা দেয়াল ও গ্রিলে ঘেরা। ফলে শ্বেতপদ্মের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয় দূর থেকেই। তাতেও মানুষের আগ্রহ কমছে না। কেউ চুপচাপ দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকছেন বিস্ময়ে দৃষ্টি মেলে। কেউ গ্রিলের ফাঁক গলিয়ে মোবাইলে ছবি তুলছেন। কেউবা সেলফি। দূরত্ব রেখেই ধরে রাখছেন মুহূর্তের প্রতিচ্ছবিতে। কেউ আবার জলের ওপর ভেসে থাকা সাদা রঙের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকছেন। কোলাহলের ভিড় নয়, এ যেন এক ধরনের নীরব সৌন্দর্যের উপভোগ।
বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন-উর রশীদ বলেন, ‘ফুলগুলো যেভাবে আছে, সেভাবেই সংরক্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে।’ পুকুরটি উন্মুক্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যে আসে, সেই ফুল ছিঁড়ে। এটি একটি হেরিটেজ, পাশাপাশি এলাকাটি ইঞ্জিনিয়ারিং অফিস এলাকা। এখানে ভিভিআইপি রেস্ট হাউসও রয়েছে। তাই এটি উন্মুক্ত করা ঠিক হবে না।’
ফিরে আসার পর এবার আগাম বার্তা- দুই বছরের শূন্যতার পর এবারই প্রথম প্রচুর পরিমাণে শ্বেতপদ্ম ফুটেছে হিমনীড়ে। এই আগাম ফুটে ওঠা যেন আরেকটি ইঙ্গিত দিচ্ছে- প্রকৃতি শুধু ফিরে আসেনি, নিজের ছন্দও খুঁজে নিতে শুরু করেছে।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা আরিফুর রহমান বলছিলেন, ‘আগে বর্ষা না এলে ফুল দেখা যেত না। এখন বর্ষার আগেই ফুটছে। এটা ভালো লক্ষণ, মানে পদ্মপুকুর আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।’ পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমানের এখন প্রশ্ন একটাই, বর্ষা পুরোপুরি নামলে কি আবারও ফুলে ফুলে ভরে উঠবে পুরো পুকুরটি?
পরিবেশ কর্মীর সঙ্গে একমত পোষণ করেন কবি হেনরী স্বপন। কবির বিশ্বাস, এই আগাম ফুটে ওঠার পেছনে রয়েছে, প্রকৃতির ভালো কিছুর ইঙ্গিত। সব ঠিক থাকলে হয়তো আগামী বছরগুলোতে পদ্মপুকুরের সেই পুরোনো অবয়ব ফিরে আসবে স্বমহিম দৃশ্যে। যেখানে জল দেখা যাবে না, শুধু দৃশ্যমান থাকবে সাদা ফুল।
বর্ষা এখনও দরজায় কড়া নাড়েনি। তবু হিমনীড় পুকুরে পদ্ম ফোটার উৎসব শুরু হয়ে গেছে আগেভাগেই। কোনো ঘোষণা নেই, কোনো আয়োজন নেই, তবু জলের বুকজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত শ্বেতপদ্ম। পদ্মফুলের মাথায় উড়ে এসে বসা হাজারো মৌমাছির মতো।
এএডি/